তাই বলে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১৪৩?

‘উইন্ডিজ সিরিজের প্রস্তুতি জিম্বাবুয়ে সিরিজে’– সিলেট টেস্টের ম্যাচপূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলনে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের এমন বক্তব্যে উপস্থিত কারোরই খটকা লাগেনি। আসলে সংশয় থাকার কথাও না। কেনই বা থাকবে?

যে দলের বিপক্ষে টানা ১৩ ওয়ানডে এবং টানা ৪ টেস্ট জয় তাদের বিপক্ষে দল আত্মবিশ্বাসী থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ফরম্যাটটা যখন নিজেদের ‘অপছন্দের’ তখন কি সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরী না! জরুরী ছিল। চিন্তা করা উচিত ছিল টেস্টে নিজেদের অবস্থানের, নিজেদের পারফরম্যান্সের উন্নতি করার।

কিন্তু ঠিক পথে কি হাঁটল বাংলাদেশ। সিলেটের অভিষেকের শুরুতেই চমকে দিল। ওই পুরনো অভ্যাস! অভিজাতের টেস্ট ক্রিকেট খেলতে নেমেছে মাত্র এক পেসার নিয়ে। শক্তির জায়গাও যদি বিবেচনাতে আনা যায় স্পিন আক্রমণ সেখানেও নেই অভিজ্ঞতা। সীমিত পরিসরের পারফরম্যান্সের বিচারে একাদশে নাজমুল ইসলাম। আর ব্যাটিংয়ে, সীমিত পরিসরে মিডল অর্ডারে যাকে (মিথুন) তৈরি করা হচ্ছে ভবিষ্যতের চিন্তায় তাকে সুযোগ না দিয়ে একাদশে দীর্ঘদিন ধরে বাইরে থাকা নাজমুল হোসেন শান্ত। শুধু কি তাই? সাকিবের পরিবর্তে অধিনায়কের দায়িত্ব পাওয়া মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের সাদা পোশাকের পারফরম্যান্স?

প্রশ্ন অনেক হলেও উত্তর দেওয়ার মানুষের অভাব! দ্বিতীয় দিনের হতশ্রী ব্যাটিংয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে যে এলেন তাইজুল ইসলাম। বোলিংয়ে ৬ উইকেট নিয়ে জিম্বাবুয়েকে ২৮২ রানে আটকে তাইজুলের খুশি থাকার কথা। তার জন্য দিনটি স্মরণীয়। অথচ সতীর্থ ব্যাটসম্যানরা তাকে কি দারুণ উপহারটাই না দিলেন? তবে তার একটি কথায় স্পষ্ট যে উইকেট ফ্ল্যাট। ব্যাটসম্যানরা চাইলেই বড় ইনিংস খেলতে পারবেন।

‘‘উইকেট খুব কঠিন ছিল না। উইকেট কিছুটা মন্থর ছিল। আপনি এই উইকেটে ফ্ল্যাট উইকেট বলতে পারেন।’’

জিম্বাবুয়ের আক্রমণের বিপক্ষে বাংলাদেশ অলআউট ১৪৩ রানে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে যা বাংলাদেশের তৃতীয় সর্বনিম্ন স্কোর। নিকট অতীতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এতো বাজে পারফরম্যান্স নেই বাংলাদেশের। ২০১৩ সালে ওদের মাটিতে করেছিল ১৩৪ রান। আর ২০০১ সালে ঘরের মাটিতে সর্বনিম্ন ১০৭ রান। আজ তো সেটাও হওয়ার সংশয় ছিল। ১৯ রানে নেই ৪ উইকেট, ৪৯ রানে ৫টি। শেষ ৫ উইকেটে এল ৯০ রান। তাতেই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল বাংলাদেশ শিবির।

একটি পরিসংখ্যান তো দলের হতশ্রী পারফরম্যান্সকে আরও ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলবে। শেষ ছয় ইনিংসে বাংলাদেশের দলীয় রান দুই’শ স্পর্শ করেনি। ঘরের মাঠে শ্রীলঙ্কাকে দিয়ে শুরু। ঢাকায় দুই ইনিংসে রান ১১০ ও ১২৩। এরপর ওয়েস্ট ইন্ডিজে দুই টেস্টে চার ইনিংসে রান ৪৩, ১৪৪ এবং ১৪৯ ও ১৬৮। এবার সেই রান ১৪৩। শেষ কবে এমনটা হয়েছিল বাংলাদেশের? পরিসংখ্যান বলছে ২০০৮ সালে সবশেষ টানা ছয় ইনিংসে দুই’শ পেরোয়নি দলীয় রান। এ পরিসংখ্যান তো বলছে, মযার্দার টেস্ট ক্রিকেটে ব্যাকগিয়ারে যাচ্ছে বাংলাদেশ দল।

দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যাটিং, ভুল শট নির্বাচন এবং অধৈর্য্য; তিনে মিলে বাংলাদেশের ইনিংস। সফরকারী দলের দুই পেসার যে পাঁচ উইকেট পেয়েছেন, মুশফিক বাদে প্রত্যেকেই উইকেট গিফট করেছেন। আহামরি কোনো টার্ন ও বাউন্স না পেয়েও সিকান্দার রাজার পকেটে তিন উইকেট। আর শন উইলিয়ামস যে বলে মিরাজকে আউট করেছেন তা ব্যাখ্যা করা কঠিন! রান আউট হয়েছেন রাহী। আরিফুলের ৪১ রান শুধুমাত্র লিড বাড়তে দেয়নি। তবুও ১৩৯ রানের লিড নিয়ে তো মাসাকাদজার মুখে চওড়া হাসি।

২০১৭ সালের জানুয়ারির পর বেশ কয়েকটি সিরিজে দলের সঙ্গে নাজমুল হোসেন শান্ত। ক্রাইস্টচার্চে ডেব্যু হলেও ভালো করেননি ওই ম্যাচে। শেষ এশিয়া কাপেও সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি। এবারও ব্যর্থ এ টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান। সেখানে দারুণ ফর্মে থাকা মিথুন সাইডবেঞ্চে।

অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহর টেস্ট পারফরম্যান্স? ২০১৫ বিশ্বকাপে যার জোড়া সেঞ্চুরি, ২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে যার সেঞ্চুরি রয়েছে তার একমাত্র টেস্ট সেঞ্চুরি কবে? প্রশ্নটা বেশ কঠিনই! ২০১০ সালে হ্যামিল্টনে মাহমুদউল্লাহর ব্যাট হেসেছিল সাদা পোশাকে। ক্যারিয়ার সেরা ১১৫ রানের ইনিংসটি খেলেছিলেন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। এরপর টেস্টে ১৩ বার পঞ্চাশ পেরিয়েছেন। কিন্তু একবারও তিন অঙ্কের ছোঁয়া পাননি। ওয়ানডেতে তার ক্যারিয়ার যতটা বর্নাঢ্য টেস্টে ঠিক ততটাই নাজুক। ৩৯ টেস্টে গড় মাত্র ২৯.৭৭। রান ২০৮৪, সেঞ্চুরি ১টি আর হাফ সেঞ্চুরি ১৫টি।

২০১৭ সালে বাংলাদেশের শততম টেস্ট দল থেকে বাদ পড়েছিলেন মাহমুদউল্লাহ। কিন্তু সীমিত পরিসরে উজ্জ্বল পারফরম্যান্সে আবার টেস্ট দলে ঢুকেন। কিন্তু টেস্টে আবার সেই ব্যর্থতার মিছিলে তিনি। ১২ ইনিংসে রান করেছেন মাত্র ২৭৫। শেষ ছয় ইনিংসে দুটিতেই রানের খাতা খুলতে পারেননি, দুই অঙ্ক ছুঁতে পারেননি দুই ইনিংসে। বাকি দুই ইনিংসে রান ১৭ ও ১৫! এবারও শূন্য।

ব্যাটিং ব্যর্থতার এমন দিনে তাইজুল বেশি কিছু বললেন না। দলের ওপর নিজের আস্থার কথা শোনালেন বারবার।

‘‘আমাদের ব্যাটসম্যানরা যে এর আগে ভালো করে নাই এমন নয়। হয়তো হঠাৎ করেই এমনটা হচ্ছে। ক্রিকেটে এমন দিন আসে। আমরা চেষ্টা করব সামনে ভালো করার। এখানে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি নেই। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে টেস্টের ব্যর্থতার আগেও আমরা বড় বড় দলকে হারিয়েছি। আর দুই একটা সিরিজ এমন হতেই পারে। আর ম্যাচ যে শেষ হয়ে গেছে তাও কিন্তু না। এখনও আরও অনেক সময় আছে এই ম্যাচে।’’

তাইজুল স্বপ্ন দেখাচ্ছেন ঘুরে দাঁড়ানোর। অভিষেক ভেন্যুতে ৬ উইকেট নিয়ে নিজের নাম ইতিহাসের পাতায় লিখেছেন এ বাঁহাতি। সতীর্থরা তার ম্যাচটিকে স্মরণীয় করে রাখতে পারে কিনা সেটাই দেখার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × four =