কোরবানি যেন লোক দেখানোর জন্য না হয়

মুসলমানদের ঈদ দু’টি। ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা। একমাস রমজানের সিয়াম সাধনার পর শাওয়াল মাসের প্রথম দিন ঈদুল ফিতর আর জিলহজ্ব মাসের ১০ তারিখ ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। হযরত ইবরাহীমের (আ.) সুন্নত পালনের দায়িত্ব দিয়ে এই কোরবানি মুসলিম বিত্তবানদের ওপর ওয়াজিব করা হয়েছে। মহান আল্লাহর নির্দেশে নবী ইবরাহীম (আ.) তাঁর পুত্র নবী ইসমাঈলকে (আ.) আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে কোরবানি করার জন্যে সার্বিকভাবে প্রস্ততি নেন। আল্লাহ তার এই কোরবানি কবুল করেন।

ঘটনার পর ঘটনা, অতঃপর ইসমাঈলের (আ.) পরিবর্তে জান্নাতের পশু (দুম্বা) কোরবানির মাধ্যমে সে ঘটনার সমাপ্তি ঘটেছিল। অন্য দিকে দ্বার উম্মোচিত হয়েছিল নতুন অধ্যায়ের। আর তাই কোরবানি। হযরত ইসমাঈল (আ.) ছিলেন হযরত ইবরাহীমের (আ.) কাছে অতি প্রিয়। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন, ‘তোমরা যা ভালোবাসো তা থেকে ব্যয় (দান) না করলে কখনো পুণ্য লাভ করবে না।’ (সূরা আল-ইমরান, আয়াত : ৯২) আল্লাহর এই বাণী থেকে আমরা বুঝতে পারি যে বান্দাহ্‌র কাছে যত বেশি প্রিয় বস্তু বা সম্পদ তাই দান করতে হয়, নইলে সেই দানের বিনিময়ে তত বেশি পুণ্য লাভ করা যায় না। কোরবানি নিঃসন্দেহে একটি মহৎ দান। কোরবানি মানে ত্যাগ। প্রিয় বস্তুকে ত্যাগ করার মাধ্যমে আমরা মহান আল্লাহর দরবারে পুণ্য লাভ করে থাকি। কোরবানি চতুষ্পদ জন্তু দিয়ে করতে হয়। একটি ছাগল দিয়ে সর্বোচ্চ এক নামে, তেমনি একটি ভেড়া বা দুম্বা দিয়েও এক নামে কোরবানি করা যায়। অন্যদিকে একটি গরু বা মহিষ বা উট দিয়ে, এক থেকে সর্বোচ্চ সাত নামের কোরবানি দেওয়া যায়।

আল্লাহ বলেন, ‘আপনি বলুন, আমার সালাত, আমার ইবাদত, আমার জীবন এবং আমার মৃত্যু আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীনের জন্য।’ (সূরা আল-আনআম, আয়াত : ১৬২) এই আয়াত থেকে আমরা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি যে, আমরা যারা মুমিন এবং মুসলমান তাদের জীবন, মৃত্যু, সালাত এবং ইবাদত সবই আল্লাহর জন্য। ইবাদতের মধ্যে আর্থিক ইবাদত হচ্ছে কোরবানি। এই কোরবানি যদিও পশু দিয়ে দেওয়া হয় মূলত মনের পশুত্বকে কোরবানি করাটাই হচ্ছে মূল প্রতিপাদ্য। আর এই কোরবানি হতে হবে একমাত্র সেই মহান রাব্বুল আ’লামীনের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য, তারই নামে এবং তার দেখানো পদ্ধতিতেই। যা আমরা মহানবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেখানো পন্থায় করে থাকি। অন্যত্র মহান আল্লাহ-জাল্লা শা’নুহু বলেন, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না তার (কোরবানির) গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাক্বওয়া।’ (সূরা আল-হজ্ব, আয়াত : ৩৭)। এখানে সরাসরি তাক্বওয়া বা খোদাভীতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ কোরবানির গোশত, রক্ত ইত্যাদি আল্লাহর উদ্দেশ্য নয়। তিনি চান আমাদের অন্তরের ভয় বা পরহেজগারী। যার প্রেরণা বা প্রভাবে আমরা আমাদের প্রিয় বস্তু কোরবানি করি। এর মানে দাঁড়ালো- আমরা যা করছি তা একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশেই করছি। আল্লাহর প্রতি ভয়ের কারণেই আমাদের অন্তর কাঁপে। যিনি আমাদের শ্রেষ্ঠ জাতি বা আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে সৃষ্টি করেছেন।

আমাদের বাংলাদেশ তথা বিশ্বের নানা দেশে এই কোরবানি নিয়ে মনে হয় যেন নানা ধরনের উপহাস হচ্ছে! কোরবানির পশু কেনা থেকে শুরু করে নানা ক্ষেত্রে তা আমরা উপলব্ধি করি। আমরা অনেক ক্ষেত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য না করে ‘পাছে লোকে কিছু বলে’র জন্য কোরবানি করি। আমরা গরু বা উট কিনি, যাতে হাঁকানো দামের কারণে পরদিন আমাদের ছবি ও গরুর ছবি আসে খবরের শিরোনাম হয়ে। এ ক্ষেত্রে আমরা ব্যবহার করি হারাম উপায়ে অর্জিত অর্থ, আমরা লোক দেখানোর জন্য পশু নির্বাচন করি, কোরবানি করি, আরো কত কি? অথচ লোক দেখানো বা ‘রিয়া’ হচ্ছে কবিরা গুনাহ। এতে যে কাজটি করা হয় তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য না করে লোক দেখানোর জন্য করা হয়। ইখলাসের সাথে কোনো কিছু করা হলে তাকে আমরা একনিষ্ঠ ভাবে আল্লাহর জন্য নিবেদিত বলে মনে করি। আর এর বিপরীত হলো এই রিয়া বা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে কিছু করা। কোরবানিতে এটি বেশি পরিমাণে দেখা যায়। আবার কখনো কখনো দেখা যায় কোরবানি এলেই রেফ্রিজারেটর, ডিপ-ফ্রিজার কেনার ধুম পড়ে যায়। মনে হয় মজুদ করে রাখার জন্য কিংবা গোশত খাওয়ার জন্যই বুঝি কোরবানি। কিন্তু না, এটা ঠিক নয়।

রিয়া অনেক রকম। তার মধ্যে প্রধানতম হচ্ছে শিরকের পর্যায়ের। কারণ যে আল্লাহর সন্তুষ্টি চায়, সে যেন সেই উদ্দেশেই সৎ কাজ করে আর কোনক্রমেই যেনো আল্লাহর ইবাদতে কাউকে শরীক না করে। এর অর্থ হচ্ছে কোরবানি হওয়া উচিৎ ছিল আল্লাহর জন্য, কিন্তু আমরা দুনিয়ার যশ বা খ্যাতির জন্য কোরবানি করছি। মিডিয়ায় আমাদের নাম প্রচারের জন্য দামী গরু বা উট ক্রয় করছি। তাহলে যার সন্তুষ্টির জন্য কাজটি করা উচিৎ ছিল তা না করে সেখানে অন্যদেরকে শরীক করছি। আল্লাহ এই শিরক সহ্য করেন না। রাসূল পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদিসে কুদসিতে বর্ণনা করেন, ‘‘আল্লাহ বলেছেন, ‘শিরককারীদের শিরক এর প্রতি আমি অমুখাপেক্ষী, যে ব্যক্তি কোন কাজ করলো এবং তাতে আমার সাথে অন্যকে শরীক করলো, আমি তাকে এবং তার শিরককে প্রত্যখ্যান করি।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২৯৮৫)

অতএব আমরা লোক দেখানোর উদ্দেশে কোরবানি বা এতদসংশ্লিষ্ট কোনো কাজ করবো না বরং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে তা করবো। আল্লাহ আমাদের সেই তাওফীক দান করুন। আমীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen − thirteen =