কোরবানির হাটে সুস্থ গরু চেনার উপায়

আসছে বুধবার। পবিত্র ঈদুল আজহা। মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। ঈদ, খুশির দিন। এই ঈদে পশু কোরবানি করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে হয়।

কোরবানির অন্যতম শর্ত হালাল অর্থে সুস্থ ও ত্রুটিমুক্ত পশু ক্রয় করা। ইতিমধ্যে জমে উঠতে শুরু করেছে কোরবানির হাট। কোরবানির গরু বা ছাগল কেনার আগে সুস্থ কিনা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। কেননা অসুস্থ পশু দিয়ে কোরবানি ধর্মে গ্রহণযোগ্য নয়। কিছু বাহ্যিক লক্ষণ খেয়াল করলে সুস্থ গরু বা ছাগল চেনা যায়। কোরবানির গরু বা ছাগল কেনার সময় যে বিষয়গুলো লক্ষ্য করবেন জেনে নিন।

আপনি প্রথমেই প্রাণীর খুব কাছে না গিয়ে নিরাপদ দূরত্ব থেকে তার গতিবিধি লক্ষ্য করুন। চলাফেরাসহ সবকিছু দেখুন। প্রথম দেখাতেই অনেক কিছু আপনার চোখে ধরা পড়বে। সে যদি নড়াচড়া বা পারিপার্শ্বিক অবস্থায় সাড়া দেয় তাহলে সুস্থতার প্রথম ধাপ পূর্ণ হবে। এরপর কাছে গিয়ে নিচে উল্লেখিত বিষয়গুলো খেয়াল করুন।

* শরীরের পশম : পশুর পশম তার শরীরের অবস্থার বহিঃপ্রকাশ। সুস্থ ও নিরোগ প্রাণীর পশম খুব চকচকে দেখায়। শরীরের চামড়ায় কোথাও কোনো ক্ষত থাকবে না। পশু যে রঙের হোক না কেন তা উজ্জ্বল দেখাবে। আর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ভালো থাকলে ত্বকে কোনো ধরনের উকুন বা আঠুলি থাকবে না। আর যদি উশকোখুশকো দেখায় তাহলে ধরে নিতে পারেন প্রাণীটি কৃমিতে আক্রান্ত। অন্যান্য কোনো চর্ম রোগে আক্রান্ত হলেও চামড়া ও পশমের কোথাও কোথাও ক্ষত বা পশমহীন থাকতে পারে।

* চলাফেরা : প্রাণীর চলাফেরা বা অঙ্গভঙ্গি দেখে সুস্থতা বোঝা যায়। সুস্থ প্রাণী থাকবে সচেতন ও সতর্ক অবস্থানে। আপনি যেমন পরিবেশ সম্পর্কে সজাগ থাকেন, ঠিক তেমনি তারাও পরিবেশের যেকোনো পরিস্থিতিতে সজাগ থাকবে। আপনি যদি তার দিকে এগিয়ে যান তাহলে সে পিছু হঠতে চেষ্টা করবে। তবে কিছু কিছু গরু বা ছাগল একটু রাগী মেজাজের থাকে। এটি অসুস্থতার লক্ষণ নয়।

* প্রতিক্রিয়া : ধরুন আপনি তাকে মারতে বা ভয় দেখাতে চাচ্ছেন এবং সে আপনার থেকে সরে যাচ্ছে বা প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। এটা সুস্থ প্রাণীর লক্ষণ।

* শ্বাস-প্রশ্বাসের স্বাভাবিকতা : সুস্থ প্রাণীর শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক থাকবে। খুব বেশি শ্বাস-প্রশ্বাস ও অস্থিরতা অসুস্থতার লক্ষণ। তবে বর্তমানে পরিবেশের তাপমাত্রা এবং শহরের হাটগুলোতে অনেক দূর থেকে গরু নিয়ে আসার কারণে, প্রথম দিকে কিছুটা শ্বাস-প্রশ্বাস বেশি হতে পারে। সজাগ দৃষ্টি রেখে দেখতে হবে। আবহাওয়াগত কারণে শ্বাস-প্রশ্বাস বেড়ে থাকলে তা কোনো রোগের লক্ষণ নয়।

* শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক : ছোট প্রাণীতে স্বাভাবিকভাবে তাপ বেশি থাকে। যেমন ছাগল বা ভেড়ার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক তাপমাত্রা ১০১.৫-১০২.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে। অন্য দিকে মহিষ ও গরুর তাপমাত্রা ১০০-১০১.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত স্বাভাবিক থাকে। যদিও গরুর হাটে থার্মোমিটার দিয়ে মাপার সুযোগ সব জায়গায় থাকে না। তারপরও আপনি চাইলে বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারেন। তবে গরুর হাটে সরাসরি রোদ পড়লে গরুর শরীর গরম হওয়ায় তাপমাত্রা কিছুটা বাড়তে পারে। এতে চিন্তার কারণ নেই।

* খাবার গ্রহণে আগ্রহ : সুস্থ প্রাণীর খাবার গ্রহণে আগ্রহ থাকবে। যদি তার সামনে খাবার থাকে তাহলে সে খাবে বা আগ্রহ প্রকাশ করবে। রুমিনেন্ট বা ৪ প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট প্রাণী যেমন- গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া এরা খাওয়ার পর পুনরায় খাবারগুলো মুখে নিয়ে আসে। অর্থাৎ জাবর কাটে। সুতরাং জাবর কাটছে এমন অবস্থা সুস্থ প্রাণীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আপনি জাবর কাটা দেখে নিশ্চিত হতে পারেন তার পরিপাকশক্তি ঠিক আছে। হাটে অনেক সময় গরুকে খাওয়ানোর ব্যবস্থা থাকে। খাওয়া অবস্থায় দেখলে তার আচরণ ও বৈশিষ্ট্য দেখে খাবারের আগ্রহ বোঝা যাবে৷

* মাজেল বা নাকের নিচের অংশ ভেজা থাকবে : সুস্থ প্রাণীর আরেকটি বৈশিষ্ট্য তার মাজেল আদ্র বা ভেজা থাকবে। আর অসুস্থ হলে তা খুব শুষ্ক থাকবে। তবে সবসময় লালা ঝরা বা ফেনা ঝরা অসুস্থতার লক্ষণ। এমন ক্ষেত্রে ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

* পায়খানা ও প্রস্রাব : সুস্থ প্রাণীর পায়খানা হবে নির্দিষ্ট ধরনের। গরুর ক্ষেত্রে খুব পাতলা বা খুব শক্ত নয় এমন। আর মলে খুব দুর্গন্ধ থাকবে না। ছাগলের ক্ষেত্রে দানাদার ও গোল বিষ্ঠা বের হয়। প্রস্রাবের রং থাকবে হালকা, খুব বেশি গাঢ় রঙের প্রস্রাব সুস্থ প্রাণীর হবে না। পায়খানার রাস্তাসহ পেছনের পা পরিষ্কার থাকবে। কারণ ডায়রিয়া হলে পিছনের পায়ের অধিকাংশ জায়গায় লেগে থাকে। খাবারের গঠনের উপর পশুর মল শক্ত বা নরম হতে পারে৷

* শরীরে পানি জমে থাকবে না : সুস্থ প্রাণীর শরীরে যদি আপনি আঙুল দিয়ে চাপ দেন, তাহলে মোটাতাজা স্বাস্থ্যের প্রাণীর ক্ষেত্রে গর্তের সৃষ্টি হবে কিন্তু ছেড়ে দিলে সঙ্গে সঙ্গে পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসবে। অবৈধ হরমোনের ব্যবহার হয়ে থাকলে গর্ত থেকে যাবে অনেকক্ষণ।

* হাঁটাচলা : কেনার আগে অল্প জায়গায় হলেও হাঁটিয়ে নেবেন। এতে পায়ে সমস্যা থাকলে ধরা পড়বে। হাটানোর সময় গরুর চারপাশের সমন্বয় লক্ষ্য রাখতে হবে। অসামঞ্জস্যতা পরিলক্ষিত হলে তা রোগের উপস্থিতি জানান দেয়৷ বিশেষ করে অবৈধ স্টেরয়েড হরমোনের ব্যবহারে গরু কিছুদুর হাটলেই এই লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে।

* গর্ভপরীক্ষা নিশ্চিত করা : কোরবানির সময় গাভী বা ছাগী কেনার আগে অবশ্যই গর্ভপরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে। গর্ভ থাকলে কেনা যাবে না। অনেক সময় গর্ভের প্রথম ২/১ মাসে তা ভালোভাবে বোঝা যায় না। এমন ক্ষেত্রে কোরবানি করার পরে পেটে বাচ্চা পেলে তাকেও জবাই করে দেয়ার বিধান ইসলামে রয়েছে বলে আলেমগণ মত দিয়েছেন।

এসব বিষয় খেয়াল করলে আশা করা যায় আপনি সুস্থ ও সবল উপযুক্ত কোরবানির প্রাণী পাবেন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে আপনার কোরবানি ও ঈদ হোক আনন্দময়।

লেখক : ডক্টর অব ভেটেরিনারি মেডিসিন, মাস্টার্স ইন প্যাথলজি, হাবিপ্রবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × 4 =