বিশ্ববাজারে তেল-গ্যাস ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার পূর্বাভাস

চলতি বছর তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লার মতো জ্বালানি পণ্যের দাম ২০ শতাংশ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। একই সঙ্গে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কথা বলেছে সংস্থাটি।

বিশ্বব্যাংকের ‘কমোডিটিস মার্কেট আউটলুক’ প্রতিবেদনে এমন পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংক এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং কয়লা অর্থাৎ জ্বালানির দাম এ বছর গড়ে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। গত অক্টোবর মাসে প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে ধারণা করা হয়েছিল, জ্বালানির দাম ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। সে হিসাবে অনুমানের চেয়ে বেশি বাড়ছে জ্বালানির দাম।

বিশ্বব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান অর্থনীতিবিদ শান্তনান দেবরাজন এ বিষয়ে বলেছেন, বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি আগের চেয়ে বেশি হারে বাড়ছে। সেই সঙ্গে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে নীতি অনিশ্চয়তার বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি।

বিশ্বব্যাংক ২০১৯ সালের জন্যও জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৬৫ ডলার থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে। তেল উত্তোলনকারী দেশগুলো তাদের উত্পাদন সীমিত রাখা এবং বিশ্ববাজারে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এমন পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশ কী পরিমাণ পণ্য উত্পাদন, আমদানি বা রপ্তানি করবে তার একটি ধারণা দেওয়া হয়েছে। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশে চাল উত্পাদনের পরিমাণ ২০১৭ সালে ৩ কোটি ৪৬ লাখ টন থেকে এ বছর (২০১৮ সালে) কিছুটা কমে ৩ কোটি ২৭ লাখ টন হতে পারে। ফলে চাল আমদানির পরিমাণ এ বছর ৩৬ লাখ মেট্রিক টন পর্যন্ত হতে পারে। চিনি আমদানির পরিমাণও ২১ লাখ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে এ বছর ২৯ লাখ মেট্রিক টন হতে পারে। একই সঙ্গে বাড়বে গম আমদানির পরিমাণও। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ ১৪ লাখ ১২ হাজার মেট্রিক টন তুলা আমদানি করেছে। ২০১৮ এবং ২০১৯ সালে এর আকার কিছুটা বেড়ে ১৫ লাখ ৭৩ হাজার এবং ১৫ লাখ ৪৬ হাজার মেট্রিক টন হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে কৃষিজাত এবং কাঁচামালের দাম এ বছর ২ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বৈরী আবহাওয়া এবং আবাদ কমে যাওয়ায় এমনটি উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ধাতব পদার্থের দাম বৃদ্ধির পূর্বাভাসও রয়েছে। বিশেষ করে, চীনে নিম্ন মানের ইস্পাত উত্পাদন কমিয়ে আনার নীতি গ্রহণ, পরিবেশবান্ধব উত্পাদনে খরচ বৃদ্ধি দাম বাড়ার একটি কারণ।

নিকেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সার্বিকভাবে ধাতব পদার্থের দাম ৯ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এ বছর নিকেলের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। সোনা ও রুপার মতো মূল্যবান ধাতুর দাম এ বছর তিন শতাংশ বাড়তে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশায় উচ্চ মূল্যের এসব ধাতব পণ্যের মূল্য বাড়বে।

বিশ্বে এ বছর খাদ্যশস্য, ভোজ্য তেল এবং অন্যান্য খাবারের দাম বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। আবাদ কম হওয়া এর একটি বড় কারণ। চলতি বছরের শুরুতে এল নিনো বায়ুপ্রবাহের কারণে মধ্য আমেরিকার কলা উত্পাদন এবং আর্জেন্টিনার সয়াবিন উত্পাদন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বিশ্ববাজারে তেমন প্রভাব পড়েনি। ২০১৪ সালে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের ব্যাপক দর পতনের ফলে তেল উত্পাদনকারী দেশগুলোর অর্থনীতি পরিবর্তন হতে শুরু করে। ব্যাপক হারে আয় কমে যাওয়ায় তেলনির্ভর দেশগুলো তাদের বাজেটে কাঁটছাঁট করে। একই সঙ্গে দেশগুলোর বেসরকারি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও কমে যায়। আয়বৈষম্য বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতাও কিছু তেলনির্ভর দেশে দেখা যায়।

বিশ্বব্যাংকের ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্স প্রসপেক্ট গ্রুপের ডিরেক্টর আয়হান কোস উল্লেখ করেন, বেশিরভাগ তেল উত্তোলনকারী দেশ আর্থিক চ্যালেঞ্জে রয়েছে। ২০১৪ সালের পর তাদের তেল থেকে আয় সবচেয়ে কমে গেছে।

বিশ্বব্যাংক বলছে, চলতি ও আগামী বছর বিশ্ববাজারে গমের দামে বিশেষ কোনো হেরফের হবে না। মার্চে যুক্তরাষ্ট্রে হার্ড রেড উইন্টার (এইচআরডব্লিউ) গমের দর টনপ্রতি ১৮১ ডলার ছিল। বছর শেষে গড়ে তা ১৯০ ডলার হতে পারে।

এ বছর বিভিন্ন ধাতুর দাম ৯ শতাংশ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সোনার দর প্রতি আউন্সে ৪২ ডলার বেড়ে ১ হাজার ৩০০ ডলারে উন্নীত হতে পারে, যা আগামী বছর কিছুটা কমবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 + 4 =