সরকারের পাঁচ প্রস্তাব নিয়ে কারাগারে বিএনপি স্থায়ী কমিটির বৈঠক

কারারুদ্ধ বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সঙ্গে গত ৭ মার্চ জেলখানায় দলের ৭ নেতার সাক্ষাৎ নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় চলছে। রাজনীতির অন্দরমহলের খোঁজ রাখার চেষ্টা যারা করেন তাদের কাছে এটা একটা বিরাট প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। কি এমন হলো যে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির ৭ সদস্য ও খালেদা জিয়ার একান্ত সচিবকে একসঙ্গে জেলখানায় প্রবেশের অনুমতি দিল সরকার। শুধু সাক্ষাৎ নয়; কারাগারে বিএনপি নেতাদের ভিআইপি আতিথ্য দেয়া হয়। আর সাক্ষাৎ পর্বটিও ছিল বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকের আদলে। বিএনপির সঙ্গে সরকারের যে বৈরি সম্পর্ক তাতে এমনটা হওয়ার কথা নয়। তারপরও কেন বিএনপি নেতারা এমন অপ্রতাশিত সুযোগ পেলেন? তাহলে কি ‘ডাল মে কুচ কালা হ্যায়?’ এমন প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে রাজি নন ওই বৈঠকে উপস্থিত কোনো নেতা। তাদের ভাষায়, ‘আমরা প্রকাশ্যেই গিয়েছি- চেয়ারপারসনের সঙ্গে আমাদের আলোচনার বিষয় ইতোমধ্যে মহাসচিব গণমাধ্যমকে অবহিত করেছেন’।

কিন্তু মহাসচিবের কথাই ওই বক্তব্যই শেষ কথা নয়, আরো কথা রয়েছে বলে জানিয়েছে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র। ওই সূত্র জানায়, প্রকাশ্যে না হলেও সরকারের সঙ্গে একটি সমঝোতা হয়েছে বিএনপির। দীর্ঘ দেন দরবারের পর অলিখিত ওই সমঝোতায় খালেদা জিয়ার সায় রয়েছে কিনা সেটা জানতেই জেলের অভ্যন্তরে বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের এ বৈঠকের আয়োজন। যার নেপথ্য কারিগর হিসেবে সরকারি দল ও প্রশাসনের কতিপয় কুশীলব কাজ করেছেন। সরকারি দলের কুশীলবদের বদৌলতেই এক সঙ্গে এত নেতা জেলখানায় প্রবেশের অনুমতি পেয়েছেন। তাদের ভিআইপি মর্যাদাও দেয়া হয়েছে সেখানে। জেল সুপারের পরিত্যক্ত যে কক্ষ তাতে নতুন করে সোফা বসিয়ে তাদের বসার ব্যবস্থা করা হয়। এমনি কি সেখানে তাদের আপ্যায়নেরও ব্যবস্থা ছিল। সরকারের আনুক‚ল্য না পেলে যেটা সম্ভব ছিল না। এমনকি আলোচনার সময় সরকারি লোকের উপস্থিতিও সেখানে ছিল না। অনেকটা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয়ের পরিবেশ বিরাজ করছিল সেখানে।

ওই দিন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়া একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভোরের কাগজকে জানান, ওই দিন কুশল বিনিময় ও খালেদা জিয়ার শারিরিক-মানসিক পরিস্থিতি জানার পরেই আলোচনায় আসে তার মামলা ও আইনি লড়াইয়ের প্রসঙ্গ। মুক্তির দাবিতে চলমান আন্দোলন কোন পর্যায়ে রয়েছে তাও জানতে চান খালেদা জিয়া। আন্দোলনের প্রতি সরকারের মনোভাব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকাণ্ডও জানতে চান তিনি। দলীয় নেতারা এক এক করে পুরো পরিস্থিতি খালেদা জিয়াকে বর্ণনা করেন। এক ফাঁকে হাসি ঠাট্টাও হয় খালেদা জিয়ার গৃহকর্মী ফাতেমাকে নিয়ে।

আলোচনা যখন ত্রিশ মিনিট ছাড়িয়ে যায়, তখনই সিনিয়র নেতাদের কেউ কেউ উসখুস করতে থাকেন। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে খালেদা জিয়া নিজেই জানতে চান অন্য কোনো বিষয় রয়েছে কিনা? সব নেতারা তখন নিশ্চুপ। মুখ খোলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ। তিনি মহাসচিব মির্জা ফখরুলকে কথা বলতে বলেন। মির্জা ফখরুল কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীরে ধীরে বলতে থাকেন, ম্যাডাম আপনার মুক্তির বিষয়ে ৫ দফা সমঝোতার প্রস্তাব রয়েছে। যদি আপনি শুনতে আগ্রহী হন তাহলে বলতে পারি। খালেদা জিয়া মাথা নেড়ে সম্মতি দিলে মির্জা ফখরুল বলেন, আপনি যদি জামিন নিয়ে লন্ডন যেতে আগ্রহী হন, তাহলে আপনার জামিন প্রশ্নে সরকারের তরফ থেকে কোনো আপত্তি দেয়া হবে না। যদি রাজি না থাকেন তবে উচ্চ আদালত আপনাকে জামিন দিলেও আপনাকে অন্য মামলায় আটক দেখিয়ে কারাগারে রাখা হবে। আগামী নির্বাচনে আপনি বা আপনার পরিবারের কেউ অংশ নেবে না, আগামী নির্বাচনে বর্তমান সরকারের অধীনে বিএনপি অংশ নেবে। নির্বাচনের আগে বিএনপির সব পর্যায়ের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চলমান মামলা স্থগিত থাকবে, মামলা ও হয়রানি বন্ধ করা হবে এবং আপনার বিরুদ্ধে চলমান মামলায় ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা হবে।

মির্জা ফখরুল এই ৫ দফা উত্থাপনের পর খালেদা জিয়া এ ব্যাপারে উপস্থিত নেতাদের মতামত জানতে চান। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আপনি আমাদের নেতা, আপনি যেভাবে বলবেন, সেভাবেই হবে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে খালেদা জিয়া বলেন, সবই ঠিক আছে কিন্তু আমি যেখানেই থাকি সেখান থেকে নির্বাচনে অংশ নেব। নির্বাচন থেকে দূরে থাকতে আমি রাজি নই। বিএনপি নেতারা খালেদা জিয়ার মনোভাবের সঙ্গে একমত হন। তাৎক্ষণিক খালেদা জিয়া উপস্থিত তার একান্ত সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারকে বিষয়টি তার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দারকে জানানোর নির্দেশ দেন।

এরপরই ব্যারিস্টার মওদুদ খালেদা জিয়াকে জানান, ১১ মার্চ নি¤œ আদালতের নথি হাইকোর্টে পৌঁছাবে। এরপরেই তার জামিনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। এর উত্তরে খালেদা জিয়া বলেন, আমি জানি, সমঝোতা না হলে অন্য মামলায় ওরা আমাকে গ্রেপ্তার দেখাবে। এ সময় খালেদা জিয়া নাম উল্লেখ না করে, তার পুত্র তারেক রহমানকে ইঙ্গিত করে বলেন, কারও উসকানিতে পা দেবেন না, এখন হঠকারিতার সময় নয়। কর্মসূচি যেন হয় শান্তিপূর্ণ। এক পর্যায়ে জেলখানা থেকে বেরিয়ে মিডিয়ার সামনে কি বলা হবে তাও আলোচনায় আসে। তখন সিদ্ধান্ত হয় এ বিষয়ে মির্জা ফখরুল কথা বলবেন, তিনি খালেদা জিয়ার শারিরিক ও মানসিক পরিস্থিতির বাইরে কোনো কথা বলবেন না। এরপই খালেদা জিয়ার সুস্বাস্থ্য কামনা করে একে একে বিদায় নেন নেতারা। এ সময় প্রত্যেকেই নিজের জন্য খালেদা জিয়ার কাছে দোয়া কামনা করেন।

জেলখানা থেকে বের হয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ নেতারা পায়ে হেটে পুলিশ ব্যারিকেডের কাছে উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে হাজির হন। সেখানে মির্জা ফখরুল বলেন, আমাদের চেয়ারপারসন সুস্থ আছেন। তার শরীর ভালো আছে, দেশের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য তিনি যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত। তার মনোবল অত্যন্ত উঁচু। তিনি সাহসিকতার সঙ্গে সব প্রতিক‚ল পরিবেশ মোকাবেলা করছেন। কারারুদ্ধ অবস্থায় তিনি দেশের কথাই চিন্তা করছেন। তার বিশ্বাস সত্য একদিন প্রতিষ্ঠা হবে। তিনি বলেন, চেয়ারপারসন শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যেতে বলেছেন। কারও উসকানিতে পা না দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। খালেদা জিয়া কারা অন্তরীণ হওয়ার পর থেকে আমরা যৌথ প্রচেষ্টায় আন্দোলন পরিচালনা করছি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলে সবকিছু পরিচালনা করছি।

সরকারের প্রস্তাব খালেদা জিয়ার কাছে পৌঁছে দেয়া এবং এ বিষয়ে তার মনোভাব বিএনপি নেতারা সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছেন। সরকার ও বিএনপি উভয় পক্ষ থেকেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। আজ সোমবার খালেদা জিয়ার জামিনের বিষয়ে আদেশ দেবেন উচ্চ আদালত। এরপরই দ্রুত ঘটতে থাকবে নানা ঘটনা- এমনটাই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। তবে বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও এ বিষয়ে উদৃত হয়ে কথা বলতে সম্মত হননি কেউই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × 1 =