ডাইনোসরের আগমন এবং হারিয়ে যাবার অবাক করা রহস্য..!

ডাইনোসর বলতে পৃথিবীতে বর্তমানে কিছু নেই। কিন্তু বিশালাকৃতির এই প্রাণীটি প্রায় ১৬০ মিলিয়ন বা ১৬০০০০০০০ বছর ধরে পৃথিবীতে বিচরণ করেছিল। কিভাবে তারা পৃথিবীতে এলো এবং কিভাবেই বা তারা হারিয়ে গেলো তা আমাদের অনেকের কাছেই অজানা।

নামকরণ:
গ্রীক শব্দ ডেনিওস (Denios) এবং সাউরোস (Sauros) থেকে এ শব্দের উৎপত্তি। Denios অর্থ ভয়ঙ্কর আর Sauros অর্থ টিকটিকি। অর্থাৎ এর পুরো অর্থ ভয়ঙ্কর টিকটিকি। বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, ডাইনোসর ছিলো মন্থর গতিসম্পন্ন, স্বল্পবুদ্ধি ও ঠান্ডা মেজাজের প্রাণী। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের ধারণার পরিবর্তন ঘটে।

আগমন:
আজ থেকে ২৩০ মিলিয়ন বছর পূর্বে। ডাইনোসরেরা ট্রায়াসিক যুগের শেষ দিকে, অর্থাৎ প্রায় ২৩ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে বসবাস করতে শুরু করে। আর ওদের শাসনকাল চলে ক্রিটেশিয়াস যুগের শেষ পর্যন্ত। অর্থাৎ ওরা পৃথিবী শাসন করেছে প্রায় ১৬ কোটি বছর। ৬৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে (ক্রিটেশিয়াস-টারশীয়ারী যুগ) এর বেশীরভাগ প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটে। আমরা বর্তমানে যে সকল পাখি দেখতে পাই, তাদেরকে ডাইনাসোরেরই কিছু প্রজাতির বিবর্তিত রূপ বলে ধারণা করা হয়। ডাইনোসরের যে সকল ফসিল বা জীবাশ্ম রয়েছে, তা থেকে বিশ্লেষিত তথ্য আমাদের এ ধারণাই দেয় যে, পাখি থেরোপড (theropod) ডাইনোসরেরই বিবর্তিত রূপ।

প্রজাতি:
এদের কিছু প্রজাতি ছিল মাংশাসী, কিছু ছিল তৃণভোজী, কিছু প্রজাতী দুপায়ে হাটতে পারত আবার কিছু প্রজাতি চারপায়ে হাটত। কোনোটি উচ্চতায় ছিল প্রায় ১০০ ফুট আবার কোনোটি ছিল মুরগীর সমান। এ পর্যন্ত ডাইনোসরের আবিষ্কৃত প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৫০০, তবে জীবাশ্ম রেকর্ডের ভিত্তিতে ১৮৫০ টি প্রজাতির সন্ধান পাওয়া যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। অর্থাৎ এখনও প্রায় ৭৫% প্রজাতি আবিষ্কারের অপেক্ষায়।

অবশ্য এর পূর্ববর্তী এক গবেষণায় পৃথিবীতে ৩৪০০ প্রজাতির ডাইনোসর ছিল বলে উল্লেখ করা হয় যার বেশীর ভাগেরই অস্তিত্ব বর্তমানে টিকে থাকা জীবাশ্মে নেই।

ডাইনোসরের বিচরণ ছিল পৃথিবীর প্রতিটি মহাদেশে, এমনকি এন্টার্কটিকায়ও এর অস্তিত্বের প্রমান পাওয়া গেছে।

বিলুপ্ত হওয়ার কারণ:

পৃথিবীতে আজ থেকে ২৩ কোটি বছর আগে তারা পৃথিবী থেকে বিলুপ্তি হয়। লক্ষ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীতে আঘাত হানা বিশালকায় ধূমকেতু কিংবা গ্রহাণুখন্ডের কারণে ডাইনোসরের বিলুপ্তি ঘটে থাকতে পারে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা। ধূমকেতু বা গ্রহাণুখণ্ড হয়ত পৃথিবীতে আছড়ে পড়ায় ধূলো আর রাসায়নিক মেঘ সূর্যালোক প্রবেশে বাধা দিয়েছে কিংবা এর বিস্ফোরণে দাবানল ঘটে অতিকায় জন্তু ডাইনোসার বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
উইনটন জীবাশ্মবীদদের জন্য একটি গুপ্ত ভাণ্ডার হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে৷ ২০০১ সালে সেখানে স্থানীয় এক কৃষক ভেড়া চরাতে গিয়ে একটি ডাইনোসরের জীবাশ্ম পেয়েছিলেন৷ তবে এবারের আবিষ্কার অস্ট্রেলিয়ায় গত ২৮ বছরের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা৷ হকনালের প্রত্যাশা, এই খাদের আশপাশে আরো শত শত জীবাশ্ম পাওয়া যাবে৷ তবে সেসব আবিষ্কারের জন্য আমাদের ভালমত প্রস্তুতি নিতে হবে৷

মেলবোর্নের লা ট্রোব ইউনিভার্সিটির জীবাশ্মবীদ বেন কিয়ার প্রায় একই কথা বলেছেন, এই আবিষ্কার অস্ট্রেলিয়ার ডাইনোসর এবং তাদের পরিবেশ নিয়ে নতুন করে গবেষণার পথ উন্মোচন করে।

বছরের পর বছর গবেষণার ফলে ভূতাত্বিক গ্লেন পেনফিল্ড মেক্সিকোর খিক্সিলওব শহরের কাছাকাছি স্থানে একটি বড় ধরণের আগ্নেয়গিরি জ্বালামুখের সন্ধান পান, যা ১১০ মাইলেরও বেশি বিস্তৃত। এটি কথিত মহাজাগতিক বিপর্যয়ের অনুকূলে স্বাক্ষী দেয়। তিনি বর্ণনা করেন, উক্ত আগ্নেয়গিরির বিষ্ফোরণ হিরোশিমা-নাগাসাকির বোমার তুলনায় এক বিলিয়ন গুণ শক্তিশালী।

একই বিষয়ের ওপর অতীতের বিশ্লেষণসমূহ দাবী করত খিক্সিউলব আগ্নেয়গিরিটি ডাইনোসরদের তিরোধানের প্রায় ৩০০,০০০ বছর আগেই শান্ত হয়ে গিয়েছিল, যা পুরো বিষয়টি আরও অস্পষ্ট করে দেয়। কিন্তু সম্প্রতি এর নিকটস্থ ধ্বংসাবশেষের নমুনা নিয়ে অত্যাধুনিক রেডিওমেট্রিক পদ্ধতিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এটাই বলতে চাইছেন যে, ডাইনোসর বিলুপ্তির পেছনে মূলত গ্রাহাণুর প্রচণ্ড আঘাত এবং তা থেকে সৃষ্ট দুর্যোগই দায়ী। সেই সাথে পৃথিবীর জলবায়ুগত প্রতিকূলতাকেও দায়ী করেছেন তারা।
তাছাড়া খাদ্যাভাবকেও অনেকে একটি উল্লেখযোগ্য কারণ মনে করেন। সেসময় মাংশাসী ডাইনোসর তৃণভোজী ডাইনোসরদের খেয়ে ফেলত বিধায় এক সময় খাদ্যাভাব সংঘটিত হয় বলে অনেকের ধারণা।

তাপমাত্রার পরিবর্তনকেও উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।অনেকের মতে সেসময় পৃথিবীব্যাপী তাপমাত্রার এক ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে যার সাথে অভিযোজিত হতে না পেরে অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়।
বিশালাকার ডাইনোসরেরা চলাফেরায় ধীর ও স্থবিরতার ফলে এবং নোংরা পরিবেশের কারণে তারা বিভিন্ন ভাইরাস ও ব্যাক্টেরিয়া ঘটিত রোগের শিকার হয় এবং এভাবে এক সময় বিলুপ্তির পথে অগ্রসর হয় বলে অনেকে মনে করেন।

তবে ডাইনোসরের বিলুপ্তিতে আরেকটি কারণকে প্রাধান্য দেয়া হয় তা হলো, তাদের ডিমের খোসার পুরুত্ব। পরীক্ষায় দেখা যায়, সাড়ে ছয় কোটি বছর আগের ডিমের খোসা ১২ থেকে ১৪ কোটি বছর আগের ডিমের খোসার চেয়ে যথেষ্ট পুরু ছিল। ফলে ডিমের খোসা ভেঙ্গে বেরিয়ে আসা বাচ্চা ডাইনোসরের পক্ষে কষ্টকর ব্যাপার ছিল। এর ফলে পরবর্তীতে ডাইনোসরের বিকলাংগতা দেখা দিত এবং প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পেত। এভাবে এক সময় তারা বিলুপ্তির দিকে অগ্রসর হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × four =