টেস্টের নাটাই শ্রীলঙ্কার হাতে

দিলরুয়ান পেরেরার সোজা বল জায়গায় দাঁড়িয়ে ড্রাইভ করতে চাইলেন মুস্তাফিজুর রহমান। বল পেল না ব্যাটের স্পর্শ। প্যাডে আঘাত করতেই শ্রীলঙ্কা দলের এলবিডব্লিউর আবেদন।

আম্পায়ার রড টাকার আঙুল তুলতে সময়নেননি। তবুও রিভিউ চাইলেন মুস্তাফিজ। কিন্তু বাঁচতে পারলেন না। মুস্তাফিজুর রহমানও বাঁচলেন না, বাংলাদেশও না। তার আউট দিয়ে বাংলাদেশ মিরপুর শের-ই-বাংলায় অলআউট ১১০ রানে।

ঘরের মাঠে এমন লজ্জার রেকর্ড কবে পেয়েছিল বাংলাদেশ? পরিসংখ্যান বলছে, নিকট অতীতেও ঘরের মাঠে নেই বাংলাদেশের এমন রেকর্ড। ১৭ বছর আগে ২০০১ সালে ১০৭ রান করেছিল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। তারপর ২০০৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১০২। মাঝে ২০০০ সালে ভারতের বিপক্ষে ৯১ এবং ২০০২ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৮৭।

দুঃস্বপ্নের সেই যুগ পাড় করে বাংলাদেশ এখন টেস্টের অন্যতম বড় দল। কিন্তু আজ সেই পুরোনো বাংলাদেশ যেন ফিরে এল মিরপুরে। ৬ উইকেট হাতে নিয়ে খেলা শুরু করলেও শেষ ৫ উইকেট বাংলাদেশ হারিয়েছে মাত্র ৩ রানে। আর ৫৬ রানে দিন শুরু করা বাংলাদেশ ৫৪ রান তুলতেই অলআউট। ১১০ রানে অলআউট হয়ে শ্রীলঙ্কাকে লিড দেয় ১১২ রানের।

অতীত রেকর্ড বাংলাদেশের আরও বিবর্ণ, ছন্নছড়া। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২০১৩ সালে হারারেতে বাংলাদেশ শূণ্য রানে হারিয়েছিল শেষ ৫ উইকেট। সেবার মুশফিকুর রহিম দলীয় ১৩৪ রানে আউট হওয়ার পর একই রানে বাংলাদেশ হারায় নাসির, এনামুল হক, রুবেল ও সোহাগ গাজীর উইকেট!

এবারের শুরুটা মুশফিকের ‘ভায়রা’ অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহকে দিয়ে। আকিলা ধনঞ্জয়ার বড় টার্ণে মাহমুদউল্লাহর ব্যাট-প্যাডের ফাঁক দিয়ে বল আঘাত করে মিডল স্ট্যাম্পে। ১০ রানে জীবন পাওয়া অধিনায়কের ইনিংস তাতেই শেষ ১৭ রানে। মাহমুদউল্লাহর উইকেট দিয়ে টেস্ট উইকেটের খাতা খোলা আকিলা দুই বল পরই পান দ্বিতীয় উইকেট। মোসাদ্দেকের পরিবর্তে দলে ফেরা সাব্বির ড্রাইভ করতে গিয়ে ক্যাচ দেন শর্ট মিড উইকেটে।

ধনাঞ্জয়া এক ওভার পরই নেন আব্দুর রাজ্জাকের উইকেট। রাজ্জাক হাওয়ায় ভাসানো বল ড্রাইভ করতে গিয়ে ফিরতি ক্যাচ দেন। এরপর তাইজুলের রান আউট ও মুস্তাফিজের আউটে ব্যাটিং ধসে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ। মাত্র ২১ বলে বাংলাদেশ হারায় শেষ পাঁচ উইকেট। মিরাজ নট আউট ৩৮ রানে।

সাত বলের ব্যবধানে ৩ উইকেট নেওয়া আকিলা শ্রীলঙ্কার সেরা বোলার। পেসার লাকমালও নিয়েছেন ৩ উইকেট।  মাইলফলক ছোঁয়ার অপেক্ষায় থাকা রঙ্গনা হেরাথ অবশ্য পাননি কোনো উইকেট।

মধ্যাহ্ন বিরতির আগে ১১২ রানের লিড নিয়ে ব্যাটিং নামে সফরকারীরা। কিন্তু কোনো উইকেট হারায়নি সে সময়ে। বিরতির পর ফিরে এসে লঙ্কান শিবিরে প্রথম আঘাত করেন রাজ্জাক। বাঁহাতি এ স্পিনারের ভিতরে ঢোকা বল মিস করে এলবিডব্লিউ হন কুশল মেন্ডিস। দ্বিতীয় উইকেটে ৩৪ রান যোগ করে প্রাথমিক ধাক্কা সামলে নেন দিমুথ করুণারত্মে ও ধনাঞ্জয়া ডি সিলভা। এ জুটি ভাঙেন তাইজুল। ধনাঞ্জয়া (২৮) ব্যাকফুটে খেলতে গিয়ে তাইজুলের শর্ট বলে বোল্ড হন।

প্রথম স্পেলে মাত্র ১ ওভার করা মুস্তাফিজ নিজের দ্বিতীয় স্পেলে ফিরেন ২৬তম ওভারে। এসেই উইকেটের স্বাদ দেন বাঁহাতি পেসার। সোজা বল একটু এগিয়ে এসে খেলতে গিয়ে এলবিডব্লিউ হন ধনাঞ্জয়া (১৭) । দ্বিতীয় সেশনে ৩ উইকেট তুলে লঙ্কানদের কিছুটা চাপে রেখেছিল বাংলাদেশ।

চা-বিরতির পর মিরাজ শুরুতেই আঘাত করেন। ডানহাতি এ স্পিনারের বলে এগিয়ে এসে ফ্লিক করতে গিয়ে শর্ট মিড উইকেটে ক্যাচ দেন করুনারত্মে (১০৫ বলে ৩২)।  টানা আট ওভার বোলিং করে লঙ্কান শিবিরে মুহুর্মুহু আক্রমণ করেন মুস্তাফিজ। দারুণ বোলিংয়ে এক পাশ থেকে চাপ দিলেও অন্য প্রান্ত থেকে স্পিনাররা তাকে সাহায্য করতে পারেননি । ফলে রান পেতে সমস্যা হয়নি অতিথীদের।

মিরাজ ৪৭তম ওভারে নিজের তৃতীয় স্পেল করতে এসে প্রথম ওভারে দিনেশ চান্দিমাল ও রোশন সিলভার জুটি ভাঙেন। মিরাজের নিচু হওয়া বলে পুল করতে গিয়ে এলবিডব্লিউ হন ৯৪ বলে ৫৮ রান করা শ্রীলঙ্কান অধিনায়ক। উইকেটে আসা ডিকাভেলা প্রথম বলেই সাজঘরে ফিরে যেতেন। কিন্তু আম্পায়ারের দেওয়া এলবিডব্লিউর সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে রিভিউ নিয়ে বেঁচে যান। এক ওভার পর ডিকভেলা ক্যাচ দেন মিড অনে। কিন্তু রাজ্জাকের হাত ফসকে বেরিয়ে যায় বল। ৪ রানে জীবন পাওয়ার পর ৯ রানে আবারও জীবন পান শ্রীলঙ্কার উইকেট রক্ষক ব্যাটসম্যান। এবার কভারে তার সহজ ক্যাচ ছাড়েন তানভীর।

তিন তিনবার বেঁচে যাওয়া ডিকভেলাকে বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। তাইজুলের বলে সুইপ করতে গিয়ে স্কয়ার লেগে মাহমুদউল্লাহর দারুণ ক্যাচে আউট হন। এরপর মিরপুরে আবারও মুস্তাফিজ ম্যাজিক। লিটনকে শর্ট কিপিংয়ে এনে দারুণ এক কাটারে উইকেটের পিছনে তালুবন্দি করান দিলরুয়ান পেরেরাকে। পরের বলে আকিলা ধনাঞ্জয়াও ক্যাচ দেন লিটনের হাতে। এবার অবশ্য লং কিপিংয়ে ছিলেন লিটন। হ্যাটট্রিক বলটি লেগ সাইড দিয়ে বেরিয়ে যায়। তবে পরের বলটিতে স্লিপে ক্যাচ দেন লাকমাল।  কিন্তু সাব্বির ক্যাচ ফেলে জীবন দেন লাকমালকে। ম্যাচে এ নিয়ে তৃতীয় ক্যাচ মিস সাব্বিরের।

এরপর ছয় ওভার দেখেশুনে খেলে কাটিয়ে দেন লাকমাল ও রোশন সিলভা। হাসিমুখে দিন শেষ করার আগে রোশন সিলভা টানা দ্বিতীয় ফিফটি তুলে নেন।

৮ উইকেটে ২০০ রানে দিন শেষ করা শ্রীলঙ্কার লিড ৩১২ রান। প্রথম দিনের মতো আজও মিরপুরে পড়েছে ১৪ উইকেট। দুই দিনে বোলারদের পকেটে ২৮ উইকেট। ঢাকা টেস্ট যে পাঁচ দিন যাচ্ছে না তা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে। দেখার বিষয় বাংলাদেশ চতুর্থ ইনিংসে কেমন ব্যাটিং করে।

শ্রীলঙ্কা লিডের যে পাহাড় বানিয়েছে সেই পাহাড় টপকাতে বাংলাদেশকে দারুণ ব্যাটিংয়ের সঙ্গে ধৈর্য্যের চূড়ান্ত পরীক্ষাও দিতে হবে। ইতিহাস বলছে এমন রেকর্ড খুব কমই আছে বাংলাদেশের। চতুর্থ ইনিংসে ২৮৫ রান করে ম্যাচ বাঁচানোর রেকর্ড আছে বাংলাদেশের। সেটাও ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে।  আর ২০০৯ সালে ২১৭ রান করে জিতেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় সারির দলের বিপক্ষে।

বিশাল লিডের বোঝা মাথায় নিয়ে দ্বিতীয় দিন শেষ করেছে বাংলাদেশ। ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিং ব্যর্থতা, ফিল্ডারদের ক্যাচ মিসের মহড়ায় ম্লান আরেকটি দিন। বোলাররা আবারও দিয়েছেন স্বস্তি। কিন্তু ম্যাচের ভাগ্য তো ব্যাটসম্যানদের হাতে। অতীত পরিসংখ্যান এবং প্রথম ইনিংসের পারফরম্যান্স ভুলে ব্যাটসম্যানরা কি দারুণ কিছু করতে পারবে? তাহলে ঢাকা টেস্টের প্রত্যাশিত ফল পরিবর্তন হলেও হতে পারে। আপাতত ম্যাচের নাটাই শ্রীলঙ্কার হাতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

6 − five =