মাথা প্রতিস্থাপন কি আদৌ সম্ভব?

ইতালিয়ান নিউরোসার্জন সার্জিও ক্যানাভারো দাবি করছেন, সম্প্রতি তিনি বিশ্বে প্রথমবারের মতো মানব মাথা প্রতিস্থাপন করেছেন। এ সার্জারির জন্য তিনি দুই বছর ধরে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। তিনি দাবি করেন যে, তিনি মৃতদেহে সফলভাবে হেড ট্রান্সপ্লান্ট বা মাথা প্রতিস্থাপন করেছেন।

সার্জিও ক্যানাভারো জানান, এরপর তিনি জীবিত মানুষের ওপরে এই কাজটি করে দেখতে চান।

কিন্তু এ ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞেরা। মাথা প্রতিস্থাপনের জন্য স্নায়ু ও রক্তনালী সংযুক্তি বা পুনঃসংযুক্তির প্রয়োজন হবে, সেই সঙ্গে আরো অন্যান্য বিষয় রয়েছে যে কারণে জীবন্ত মানুষের দেহে মাথা প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন নাও হতে পারে।

নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব মেডিসিনের মেডিক্যাল এথিকস বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান আর্থার ক্যাপলান বলেন, আমি এনওয়াইইউতে ফেস ট্রান্সপ্লান্ট নিয়ে কাজ করা গ্রুপের সঙ্গে কাজ করি এবং আমরা এ কাজটি খুব সাদামাটাভাবে করতে পারি। তিনি ফিউচারিজমকে বলেন, মানুষের দেহে মাথা প্রতিস্থাপন একটি হাস্যকর বিষয়। আমরা কোনোমতে চেহারাকে রিজেক্ট হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারি।

অধ্যাপক ক্যাপলান বলেন, তিনি (ক্যানাভারো) মাথা প্রতিস্থাপন সম্পর্কে যা বলেছেন তা একটি সকেট থেকে বাল্ব সরিয়ে নতুন একটি বাল্ব স্থাপন করার মতো শোনায়। কিন্তু স্পষ্টত নতুন মস্তিষ্ক আলাদা করা এবং স্নায়ু সংযুক্তির কেমিস্ট্রি খুব ভিন্ন হবে। মাথা প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে আপনি কাউকে জীবিত রাখতে পারলেও আমি মনে করি ইমিউন রিজেকশনের প্রভাবে তাদের মস্তিষ্ক বিকৃত হতে পারে, কারণ মস্তিষ্ক নতুন পরিবেশে প্রসেস করতে সক্ষম হবে না। আমি ধারণা করছি, এটি মাথা প্রতিস্থাপনের জন্য প্রতিবন্ধক।

ক্যাপলান খুব শিগগির সফল মাথা প্রতিস্থাপনের আশা করেন না। তিনি এক্ষেত্রে আরো অধিক ফলপ্রসূ ফলাফলের জন্য রিজেনারেটিভ মেডিসিন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

মাথা প্রতিস্থাপন প্রসংগে ক্যাপলান বলেন, এটি প্রকৃত বিজ্ঞানের জন্য নিন্দিত ও ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি যোগ করেন, আমি বলব যে, তার (ক্যানাভারো) দাবি মূলত প্রেস রিলিজের ঘোষণা। তিনি চীনে গবেষণা করছেন, কারণ তিনি (ক্যানাভারো) যা করছেন তাতে বিশ্বের অন্য কোনো দেশের বিশ্বাস নেই। তিনি প্রাণীদের মধ্যে স্পাইনাল কর্ড সংযোজন করতে পারেননি।

ক্যানাভারো কর্তৃক বানর ও ইঁদুরের ওপর সম্পাদিত সার্জারি নিয়ে ক্যাপলান সন্দেহ প্রকাশ করেন। ক্যানাভারো দাবি করেন যে, তিনি এদের (বানর ও ইঁদুর) মধ্যে পুনরায় স্পাইনাল কর্ড সংযোজন করেন, কিন্তু তাদেরকে উল্লেখযোগ্য সময় পর্যন্ত জীবন্ত বা সজ্ঞান রাখতে সমর্থ হননি।

ক্যানাভারোর দাবিকৃত বানরের মাথা প্রতিস্থাপনে স্পাইনাল কর্ড পুনঃসংযোজনের কোনো প্রচেষ্টা অন্তর্ভুক্ত ছিল না, যার মানে দাঁড়ায়- যদি কোনো সমস্যা ছাড়াও সার্জারি সম্পন্ন হয়, তবুও রোগীর প্যারালাইজ হয়ে যাবে। যদি কেউ সফলভাবে স্পাইনাল কর্ড সংযোজন করতে পারেন, তাহলে তা মাথা প্রতিস্থাপন পদ্ধতির পরিবর্তে চিকিৎসার জন্য আরো বেশি উপযোগী হবে।

ক্যাপলানের মতে, যদি তিনি (ক্যানাভারো) জানেন কিভাবে স্পাইনাল কর্ড রিজেনারেট করা যায়, তাহলে সাহায্য করার জন্য বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মানুষ রয়েছে যাদের স্পাইনাল কর্ড ক্ষতিগ্রস্ত ও ছিন্ন হয়েছে। মাথা প্রতিস্থাপন সম্পর্কে অহর্নিশ বাচালতা না করে তার উচিত হবে স্পাইনাল কর্ড রিজেনারেট অবলম্বনে তাদেরকে সাহায্য করা।

অধ্যাপক ক্যানাভারোর দাবিগুলো আধুনিক প্রযুক্তির প্রকৃত সম্ভাবনার পানিকে ঘোলা করে দিচ্ছে। এটি শুধুমাত্র ট্রান্সপ্লান্টেশন বা প্রতিস্থাপনতা নিয়ে কাজ করা লোকদের প্রভাবিত করছে না, এটি বৃহত্তর বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়কেও প্রভাবিত করছে।

অবিবেচনাপ্রসূত প্রযুক্তি ব্যবহারের খারাপ প্রভাব প্রসঙ্গে ক্যাপলান বলেন, লোকেরা বিশ্বাস করে যে শক্তিশালী প্রযুক্তি ব্যবহার করা বিজ্ঞানীরা নিজেদেরকে কেন্দ্র করে নির্বুদ্ধিতার সঙ্গে প্রযুক্তি ব্যবহার করবে। এটি মূলধারার বিজ্ঞানীদের জন্য দুর্নাম এনে দেয়। তারা ক্লোনিং করার চেষ্টা করতে পারে অথবা তারা সুপারবেবি বানানোর চেষ্টা করতে পারে। আপনার কাছে এটা অসংগতিপূর্ণ মনে হতে পারে। তাদের নিয়ে খুব মিডিয়া কভারেজ হয়। তাই মূলধারার বিজ্ঞানী ও ডাক্তারদের বিশ্বাসযোগ্যতার বিষয়ে আপনি সন্দেহ করেন।

মাথা প্রতিস্থাপনের মতো অপ্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো মানুষের মনে মিথ্যা আশার সঞ্চার করে। প্যারালাইজ কিংবা ভয়ংকর রোগে ভোগা লোকেরা চিন্তা করতে পারে, হয়তো আমি মাথা প্রতিস্থাপন করতে পারব। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি সরবরাহ না হলে তারা হতাশা নিয়ে ক্রুদ্ধ হয়।

যেসব বিজ্ঞানী ও ডাক্তাররা আধুনিক ওষুধের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে চায় তাদের নৈতিক দায়িত্ব থাকা উচিত। যদি তারা তাদের কাজের সুযোগকে ভুলভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে, তাহলে তারা শুধুমাত্র তাদের সহকর্মীদেরই ক্ষতি করে না, সাধারণ লোকদের মাঝেও প্রযুক্তির উপকারের ব্যাপারে সন্দেহের জন্ম দেয়।

তথ্যসূত্র : ফিউচারিজম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two × 2 =