নির্বাচনে যে সংকট মোকাবেলা করতে হবে

গত দুই নভেম্বর ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগ ও মহানগর আওয়ামী লীগের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। সমাবেশে ব্যাপক লোক সমাগম হয়েছিলো এবং আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে ছিলেন অনেকেই। তবে আওয়ামী লীগের প্রাক্তন সংসদ সদস্য, জেলা আওয়ামী লীগের ১৩ বছর দায়িত্বপ্রাপ্ত সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন সরকার সমাবেশের আমন্ত্রণ পাননি। তারপরও সমাবেশে তিনি মিছিল নিয়ে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু মঞ্চে তার জায়গা হয়নি। আবার এটাও সত্য যে, সমাবেশ মঞ্চে এমন অনেকের জায়গা হয়েছে যাদের ‘নব্য আওয়ামী লীগার’ হিসেবে অনেকেই জানেন। এই চিত্রটিই বাংলাদেশের অনেক জায়গায় দেখা যাচ্ছে। বলতে দ্বিধা নেই, এটি ভোটের রাজনীতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিশেষ করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করার সক্ষমতা দেখাতে হবে আওয়ামী লীগকে দলের বৃহত্তর স্বার্থে।

অতি উৎসাহী কর্মীরা যে কোনো দলের জন্যই অশণিসংকেত। দলের প্রতি অনুগত নেতাকর্মীরা অবশ্যই দলীয় প্রধানের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান দেখাবে। উল্লেখ করা যায়, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী কোনো এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন- উপজেলা চেয়ারম্যান, মেয়ররা আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাবেন না। অর্থাৎ প্রকারান্তরে তাদের প্রার্থীতা থেকে বিরত থাকার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু তারপরও উপজেলা পর্যায়ে উঠতি নেতাদের দ্বারা মেয়র, চেয়ারম্যানদের সমর্থনে জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন চেয়ে পোস্টার, ব্যানার করা হচ্ছে। এসব অতি উৎসাহী কর্মীরা দলীয় কোন্দল জিইয়ে রেখে নিজেদের ফায়দা লোটার প্রচেষ্টায় অব্যাহতভাবে তাদের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি অন্তর্নিহিত দৃষ্টি দিয়ে বিবেচনা করলে বলা যায়, ব্যাপারটি দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের সাথে সাংঘর্ষিক। আওয়ামী লীগে একমাত্র শেখ হাসিনাকে অটল ও অটুট অবস্থায় আমরা দেখেছি। অন্যদের বিষয়ে নানাবিধ শঙ্কা ও আশঙ্কা পরিলক্ষিত হওয়ার অবকাশ রয়েছে এবং নানা ঘটনা প্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে আজ তা প্রমাণিত।

কাজেই আওয়ামী লীগের সভাপতির সিদ্ধান্ত যারা অমান্য করে তারা যতই দলের বিভিন্ন ইউনিটে দায়িত্বপ্রাপ্ত হোক না কেন; দলের জন্য ঐ মানুষগুলো অবশ্যই ক্ষতিকর। এ রকম পদবিধারীদের বিষয়ে আওয়ামী লীগের হাই কমান্ডকে সচেতন ও সজাগ থাকতে হবে। অন্যথায় জাতীয় নির্বাচনে তা বিপরীত প্রভাব ফেলতে পারে। দলীয় হাই কমান্ড থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত হাইব্রিড নেতাকর্মীদের অত্যাচারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আওয়ামী লীগের ত্যাগী কর্মীরা। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বিভিন্ন সভা সমাবেশে বলেছেন; ত্যাগীরাই আওয়ামী লীগের প্রাণ। সেই ত্যাগী কর্মীদের বিভিন্নভাবে অবজ্ঞা করা হচ্ছে, মাঠ পর্যায়ের ত্যাগী কর্মীদের সাথে আলাপ-আলোচনা করলে বৈষম্যমূলক বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। এমপি, মন্ত্রীদের সাথে নেতাকর্মীদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। আসন্ন নির্বাচনে এ বিষয়গুলো নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করবে বলেই মনে করি।

উপজেলা কিংবা ইউনিয়ন পর্যায়ে মূল সংগঠন আওয়ামী লীগের সাথে অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছে বেশ কিছু সংসদীয় এলাকায়। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে মনোনয়নকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ, যুবলীগসহ অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের মধ্যকার দূরত্ব আগামী নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্ট হয়ে দাঁড়াতে পারে নির্বাচনে জয়লাভের ক্ষেত্রে। তাছাড়া সৃষ্ট জটিলতা নিরসনের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। এমনো দেখা যাচ্ছে, তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সাথে একত্রিত হয়ে অন্যান্য সহযোগী সংগঠনগুলো দলীয় অনুষ্ঠান একসঙ্গে পালন করতে পারছে না। দলীয় ঐক্য ছাড়া নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে হলে আওয়ামী লীগকে অবশ্যই ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হবে। যে কোন মূল্যে তৃণমূলকে সংগঠিত করে ত্যাগীদের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দায়িত্ব দিয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় দল পরিচালনা করা উচিত।

তাছাড়া, আওয়ামী লীগের জোটভিত্তিক রাজনীতির কারণে বেশ কিছু আসনে জনপ্রিয় প্রার্থী থাকার পরেও জোটের প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ায় দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম অনেকটা স্থবির। এর বাইরে কিছু স্থানে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির কারণে উদীয়মান তরুণ নেতারা পদ-পদবিতে না থাকায় দলীয়ভাবে আওয়ামী লীগ একাট্টা হয়ে উঠতে পারছে না। বিভিন্ন গ্রুপ, উপগ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিষয়গুলো নজরে এনে এর সমাধান করতে হবে।

বর্তমান সরকারের আমলে যে সব দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়েছে আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ে বিশেষ করে ইউনিয়ন এবং গ্রাম পর্যায়ে তার স্বপক্ষে প্রচার প্রচারণাও অপ্রতুল। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি এক পক্ষের এবং সাধারণ সম্পাদক ভিন্ন পক্ষের অনুসারী। দুই পক্ষের মধ্যে ভিন্নতা থাকায় দলীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড জনসাধারণের নিকট পৌঁছানোর ক্ষেত্রে দলীয় প্রচেষ্টার অভাব পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। কেন্দ্রীয়ভাবে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মনিটরিং খুব একটা করা হয় না বিধায় তৃণমূলের সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা যায়। আবার এমনো দেখা যায়, ইউনিয়ন পর্যায়ে আওয়ামী লীগের ব্যানারে নির্বাচিত চেয়ারম্যান অন্য দলের নেতাকর্মীদের বলয়ে পরিবেষ্টিত থাকে। ফলশ্রুতিতে আওয়ামী লীগের কর্মীদের কাছ থেকে দূরত্ব তৈরি হয়। এসব বিষয়ে সুদৃষ্টি এখনই দেওয়া উচিত বলে মনে করি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নির্বাচন প্রচারণা ও পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পক্ষ সর্বদা গুজব উসকিয়ে দেওয়া ও বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটি সুচারুরূপে করে। গুজব খুব দ্রুত নানামুখী নেতিবাচক ও বিদ্রূপাত্মক সংবাদের সৃষ্টি করে। এসবের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগকে তফসিল ঘোষণার সাথে সাথে উদ্যমী এবং যুক্তিসংগত উপায় বের করে গুজবের রটনার অবসান ঘটাতে ব্যাপকভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে। এটা জরুরীভাবে করতে হবে। অন্যথায়, গুজব ভোটের মাঠে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সব থেকে তাৎপর্যপূর্ণ ও অন্যতম সিদ্ধান্তের পরিপূরক হচ্ছে উপযুক্ত প্রার্থীর মনোনয়ন নিশ্চিত করা। লক্ষ্য করার মতো বিষয় হচ্ছে, প্রত্যেক নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আগাম বার্তা দিয়ে আসছেন ৫-৬ জন প্রার্থী। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ও অনলাইন নিউজে প্রার্থীদের স্বপক্ষে সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। উল্লেখ্য, এদের মধ্যে অবশ্য অনেকেই আছেন মৌসুমী পাখি। নির্বাচনের প্রাক্কালে তারা পোস্টার, ব্যানার সাঁটিয়ে জনগণ ও দলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান। তাদের ধারণা, আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়ে গেলেই নির্বাচনে জয়লাভ সহজতর হবে। কিন্তু বাংলার জনগণ উড়ে এসে জুড়ে বসাদের কখনোই গ্রহণ করেনি। আওয়ামী লীগকেও দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার পূর্বে প্রার্থীর রাজনৈতিক সংযুক্ততা ও এলাকায় জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা যাচাই বাছাই করে প্রার্থী মনোনয়ন নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় দলীয় প্রার্থী জয়লাভের ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়বে।

উপর্যুক্ত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয় যে, আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে নিজ দলের অনেক উচ্চাভিলাষী প্রার্থীর সাথে নির্বাচনের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হতে পারে। অবশ্য দলের সাধারণ সম্পাদক বিদ্রোহী প্রার্থীদের ব্যাপারে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। এখন যত দ্রুত সম্ভব বিভেদ ভুলে তৃণমূলের মূল্যবান মতামতের ভিত্তিতে তাদের নিয়েই মানুষের কাছে যেতে হবে। কর্মীদের সম্মিলিতভাবে তুলে ধরতে হবে দেশের উন্নয়নের চিত্র।

লেখক: প্রভাষক, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seven + nine =