অসহায় আত্মসমর্পণে বিব্রতকর হার

তেড়েফুঁড়ে ড্রেসিং রুমের দিকে এগিয়ে মাহমুদউল্লাহ। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার পথে ব্যাট আঘাত করলেন মাটিতে। রাগে ছুড়ে ফেললেন গ্লাভস। নিজের আউটে এত রাগ-ক্ষোভ এর আগে কখনো কি হয়েছেন মাহমুদউল্লাহ! এটা শুধু মাহমুদউল্লাহ নয়, পুরো দলের চিত্র।

সীমিত পরিসরের ক্রিকেটে সাফল্যের ভান্ডার যখন টইটুম্বুর তখন ক্রিকেটের অভিজাত শ্রেণিতে বাংলাদেশ চলছে ব্যাকগিয়ারে। সবচেয়ে বেশি হতাশ করছেন ব্যাটসম্যানরা। শেষ আট ইনিংসে নেই দলীয় দুইশ! এর মধ্যে চারবারই দেশের মাটিতে। ভাবা যায়?

জিম্বাবুয়ের সাদামাটা বোলিংয়ের বিপক্ষে নিজেদের চিরচেনা কন্ডিশনেও দুইশ হবে না! প্রথম ইনিংসে ১৪৩ রান হতে পারে অঘটন। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসের ১৬৯ কিসের আলামত? ৩২১ রানের লক্ষ্য তাড়ায় সিলেটের অভিষেক টেস্টে বাংলাদেশ হেরে বসল ১৫১ রানের বিশাল ব্যবধানে। বাংলাদেশ নয়, সিলেটের অভিষেক টেস্ট রাঙিয়ে রাখল জিম্বাবুয়ে।

দেশের বাইরে জিম্বাবুয়ের এটি মাত্র তৃতীয় জয়, শেষ পাঁচ বছরে প্রথম টেস্ট জয়। আরেকটি অর্জন তো আরো মর্যাদার। ১৭ বছর পর দেশের বাইরে টেস্ট জিতল মাসাকাদজা, সিকান্দার রাজারা। সবশেষটাও বাংলাদেশের বিপক্ষেই, ২০০১ সালে চট্টগ্রামে।

ভুল শট নির্বাচন, অধৈর্য, দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যাটিং; তিনে মিলে বাংলাদেশের ব্যাটিং চিত্র। আহামরি কোনো বোলিং করেনি জিম্বাবুয়ের স্পিনাররা। সামান্য দায়িত্ব নিতে পারলেই যেকোনো ব্যাটসম্যান খেলতে পারতেন লম্বা ইনিংস। কিন্তু ‘ডমিনো এফেক্ট’ ভর করল টাইগার শিবিরে।

জয় পেতে আজ চতুর্থ দিনে ১০ উইকেট পেতে হতো জিম্বাবুয়েকে। বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ২৯৫ রান। গতকাল বিনা উইকেটে ২৬ রান তুলে আত্মবিশ্বাস নিয়ে শেষ করেছিলেন লিটন ও ইমরুল। আজ শুরুতেও তারা একই ধারাবাহিকতা দেখিয়েছেন। কিন্তু উদ্বোধনী জুটি ভাঙার পর তাসের ঘরের মতো ভাঙতে থাকে বাংলাদেশের ব্যাটিং অর্ডার।

হতশ্রী ব্যাটিংয়ে সবচেয়ে হতাশার, ১০ উইকেট তুলে জয় পেতে দারুণ কোনো বোলিং করতে হয়নি জিম্বাবুয়েকে। মেহেদী হাসান মিরাজের উইকেট বাদে প্রত্যেক ব্যাটসম্যানই নিজেদের উইকেট বিলিয়ে এসেছেন। অথচ শুরুটা ছিল দারুণ। শেষ সাত ইনিংসে সর্বোচ্চ ওপেনিং রানের জুটি, ৫৬। কিন্তু সেখানেও যেন ভাগ্যের ছোঁয়া।

দিনের প্রথম ওভারে টেন্ডাই চাতারার বলে লিটনের ব্যাট থেকে আসে বাউন্ডারি। কিন্তু চতুর্থ ওভারেই দুবার জীবন পান দুই ব্যাটসম্যান। দ্বিতীয় বলে ইমরুলের ক্যাচ একটুর জন্য তালুবন্দি করতে পারেননি ব্রায়ান চারি। ষষ্ঠ বলে লিটনের ক্যাচ ধরে ছেড়ে দেন ওই চারিই। পেসার কাইল জার্ভিস এসেই আক্রমণ চালান স্বাগতিক শিবিরে। কিন্তু দ্বিতীয় স্লিপে ব্রেন্ডন টেলর ইমরুলের ক্যাচ ছাড়েন। ২০ মিনিটে তিন সুযোগ হাতছাড়া করে জিম্বাবুয়ে তখন উইকেটের খোঁজে।

দলকে এগিয়ে নিতে এগিয়ে আসেন সিকান্দার রাজা। লিটন পুল করতে গিয়ে অফ স্পিনারের বল মিস করেন। জিম্বাবুয়ের আবেদনে সাড়া দেননি আম্পায়ার কেটলবরো। আম্পায়ারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে লিটনের এলবিডব্লিউয়ের আবেদন জেতেন রাজা।

রাজাকে এগিয়ে এসে চার মেরে শুরুটা ভালোই করেছিলেন মুমিনুল হক। কিন্তু তাকে ফেরানোর দায়িত্বটা নেন জার্ভিস। অফ স্টাম্পের বাইরের বল টেনে এনে বোল্ড মুমিনুল। পরের তিনটি আউট বেশ দৃষ্টিকটু। রাজার বলে সুইপ করতে গিয়ে লেগ স্টাম্প হারান ওয়ানডে সিরিজে ৩৪৯ রান করা ইমরুল। একই বোলারের বলে শট নির্বাচনে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা মাহমুদউল্লাহ সুইপ করতে গিয়ে ১৬ রানে আরভিনের হাতে ক্যাচ দেন। তখন লাঞ্চের বাকি মাত্র ১৮ মিনিট।

ওই সময়ে মাত্র দুই ওভার বোলিংয়ের সুযোগ পান ব্রেন্ডন মাভুতা। লেগ স্পিনারের হাত ধরে আসে পঞ্চম সাফল্য। গুগলির সঙ্গে খানিকটা বাউন্স। অহেতুক শট খেলতে গিয়ে রাজার দুর্দান্ত ক্যাচে পরিণত ৩২ বলে ১৩ রান করা শান্ত। ম্যারাথন বোলিং স্পেলে (১৭ ওভার) প্রথম সেশনে বাংলাদেশকে ডুবিয়েছেন রাজা। ১১১ রান তুলতেই নেই বাংলাদেশের ৫ উইকেট।

মধ্যাহ্ন বিরতিতেই জয় দেখছিল জিম্বাবুয়ে। হাতে ৫ উইকেট রেখে ২১০ করার চিন্তা তো বোকামি। ওই পথে পা বাড়ায়নি কোনো ব্যাটসম্যান। উল্টো কে কত আগে সাজঘরে ফিরতে পারেন, সেই প্রতিযোগিতা চলছিল নিজেদের মধ্যে!

মাভুতার বলে স্লগ সুইপ খেলতে গিয়ে ওয়েলিংটন মাসাকাদজার দুর্দান্ত ক্যাচে পরিণত হন মুশফিকুর রহিম (১৩)। মিরাজকে ফেরাতে ইনিংসের সেরা বল করেন মাভুতা। টার্নের সঙ্গে বাউন্স। উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন ৭ রান করা মিরাজ। এরপর তাইজুল ইসলাম ও নাজমুল ইসলাম অপু ফেরেন কোনো রান যোগ না করেই।

সাতে নামা অভিষিক্ত আরিফুল হক জিম্বাবুয়ের জয় বিলম্বিত করেন খানিকটা সময়ের জন্য। প্রথম ইনিংসে ৯ রানের জন্য হাফ সেঞ্চুরি পাননি সতীর্থের অভাবে। এবার শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হন ৩৮ রানে। দুই ইনিংসে ৭৯ রান করে অন্তত নিজের জায়গা ঢাকা টেস্টের জন্য পাকাপাকি করেছেন আরিফুল।

তার উইকেটের সঙ্গে সঙ্গে উল্লাস শুরু হয় সফরকারী শিবিরে। উইকেট নিয়ে শুরু হয় কাড়াকাড়ি। দীর্ঘ ১৯ ম্যাচ পর আন্তর্জাতিক ম্যাচ জয়ের আনন্দই তো আলাদা হবেই। বেচারা তাইজুল! দুই ইনিংস মিলিয়ে ১১ উইকেট নিয়েও পরাজিত দলে। আর শন উইলিয়ামস ১০৮ (৮৮+২০) রান করে পেয়েছেন ম্যাচসেরার পুরস্কার।

মঙ্গলবার দিনের শুরু থেকেই সিলেটের গ্যালারি ভরা। গোমট আবহাওয়া উপেক্ষা করে মাঠে হাজির ক্রিকেটপ্রেমীরা। কারণটাও স্পষ্ট ছিল। প্রথম তিন দিন শুরুতে ব্যাটিংয়ে ছিল জিম্বাবুয়ে। চতুর্থ দিনের শুরুতেই ব্যাটিংয়ে স্বাগতিকরা। দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে দর্শক।

কিন্তু সিলেট টেস্টটা হয়তো ভুলেই যেতে চাইবেন বাংলাদেশের ক্রিকেটার ও সমর্থকরা। প্রথম ইনিংসে ১৪৩ রানে অলআউট হওয়ার দুঃসহ স্মৃতি কে-ই বা মনে রাখতে চাইবে। আর দ্বিতীয় ইনিংসের ব্যাটিং তো বাড়িয়েছে কষ্ট, দিয়েছে লজ্জা। ১৭ বছর পর দেশের বাইরে টেস্ট জয়ের আনন্দে জিম্বাবুয়ে যখন ড্রেসিংরুমে উল্লসিত, সেখানে বাংলাদেশের ড্রেসিং রুমে বেদনার সুর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 + 5 =