আপসহীন আন্দোলন চালিয়ে যাব : কামাল

ঐক্যবদ্ধ থেকে আপসহীন আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন।

কারান্তরীণ খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে তিনি বলেন, ‘যে দেশে বড় একটি দলের নেত্রীকে শ্রদ্ধা জানানো হবে না, সেই দেশে গণতন্ত্র চলতে পারে না।’

মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

সরকারের পদত্যাগ, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অবাধ নির্বাচন, খালেদা জিয়াসহ সকল বন্দির মুক্তি ও ৭ দফা দাবি আদায়ে এই জনসভার আয়োজন করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

ড. কামাল বলেন, ‘ঐক্যবদ্ধ হয়েছি, ঐক্যবদ্ধ থাকবো। ঐক্যবদ্ধ হয়ে সিদ্ধান্তগুলো নেবো দেশের অন্যায় থেকে মুক্তি পেতে। সুষ্ঠু নির্বাচন হতে হবে। ভোটাকিারের জন্য সবাইকে পাহারাদার হতে হবে। পাহারাদার হওয়া মানে স্বাধীনতা পাহারা দেওয়া। স্বাধীনতা মানে জনগণ দেশের মালিক। মালিকানা হলো ভোটাধিকার প্রয়োগ। যদি সুষ্ঠু ভোট না হয় তাহলে স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে যায়।’

‘তাই স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আমরা এখান থেকে শপথ নিয়ে যাই আপসহীনভাবে এই আন্দোলন চালিয়ে যাবো। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে সকল জনগণের রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার আমরা ফিরে পাবো। এই রাষ্ট্র আপনার আমাদের সকলের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসবে।’

গত পাঁচবছর দেশের অবস্থা ভয়াবহ ছিলো দাবি করে সংবিধানের অন্যতম এই প্রণেতা বলেন, ‘সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকবেন। স্বাধীনতার লক্ষ্য ছিলো যে, এই দেশের মালিক জনগণ। সেটি বলতে হবে যে, আমরাই এই দেশের মালিক আর কেউ না। এই দেশ কোনো রাজতন্ত্র না। আমরাই শাসক; আপনারা শাসকের ভুমিকায় থাকবেন।’

দেশে আইনের শাসন অনুপস্থিত মন্তব্য করে ড. কামাল বলেন, ‘আজকে যে ভাবে আইনের শাসন অনুপস্থিত, যাকে তাকে যেনতেনভাবে ধরে নিয়ে জেলে অন্তরীণ করা হচ্ছে।’

বক্তব্যের প্রারম্ভে খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে তিনি বলেন, ‘আজকে বক্তব্যের শুরুতেই খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করি। অন্য যারা আছেন তাদেরও মুক্তি দাবি করি। যে দেশে বড় একটি দলের নেত্রীকে শ্রদ্ধা জানানো হবে না, সেই দেশে গণতন্ত্র চলতে পারে না।’

কামাল বলেন, ‘যে গণতন্ত্র মানে না, রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে, সে যা ইচ্ছে করতে পারে। আইনের যা ব্যাখ্যা দেয় তাই হয়। কিন্তু আইন এভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। বিরোধী দলের জন্য এক আইন, সরকারি দলের জন্য আরেক আইন! এটা হয় না। সরকারি দল সব আইনের ঊর্ধ্বে আর একটি বড় দলকে যেনতেনভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়। প্রত্যেকদিনই বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের হয়রানি করতে হয়। জেলে নিতে হয়। এটা বন্ধ করতে হবে। স্বাধীন বাংলাদেশে এটা চলতে পারে না।’

আওয়ামী লীগ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর সব দলের সঙ্গে আলোচনা করে একটি অবাধ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো জানিয়ে ড. কামাল বলেন, ‘আমি ছিলাম কোর্টে। তখন বলা হয়েছিলো, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সাময়িক। দ্রুত একটা নির্বাচন দেওয়া হবে। বলা হয়েছিলো সবার সঙ্গে আলোচনা করে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে। এই কথার প্রেক্ষিতে আমি বলেছি, যখন এটা বলেছে তখন আমার আর কি বলার আছে। কিন্তু সরকারের কথার যে এক পয়সারও দাম নেই, পাঁচ বছরে তারা তা প্রমাণ করেছে। পুরো পাঁচ বছর চালিয়ে দিলেন। এটা কি ধরনের বিবেকের পরিচয়?’

সরকার সংবিধান উপক্ষো করে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে বলেও এ সময় অভিযোগ করেন গণফোরাম প্রধান।

জনগণকে শক্তভাবে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন বাঁচার উপায় হচ্ছে দেশের মালিক জনতাকে দাঁড়াতে হবে, শক্তভাবে দাঁড়াতে হবে।’

জনসভায় আসার পথে বাস-ট্রেন-লঞ্চ বন্ধ করে সরকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে অভিযোগ করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের এই নেতা বলেন, ‘রাস্তা বন্ধ করে বাস লঞ্চ বন্ধ করে জনগণকে নিস্ক্রিয় করা যাবে না।’

নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘এই দেশের মালিকানা ১৬ কোটি মানুষের। এটি উদ্ধার করতে হবে। মানুষের মাঝে এই কথাগুলো ছড়িয়ে দিতে হবে। আমরা ঘুমিয়ে থাকতে পারি না। আজকে দেশের মালিকরা জেগেছে। এই জাগরনের মধ্যে আমরা জনগণকে দেশের মালিক করে ছাড়বো।’

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় প্রধান বক্তা ছিলেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জেএসডির আসম আবদুর রব।

এছাড়া বক্তব্য রাখেন- কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, গণফোরামের মোস্তফা মহসীন মন্টু, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম মিয়া, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রা, ডাকসুর প্রাক্তন ভিপি সুলতাম মুহাম্মদ মনসুর, গণস্বাস্থ্যের ডা. জাফরুল্লাহ, জমিয়তে উলামায়ের মাওলানা নুর কাশেমী, বিএনপি নেতা জয়নুল আবেদীন, গণফোরামের সুব্রত চৌধুরী, বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ, কল্যাণ পার্টির সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, বিএনপির আবদুল্লাহ আল নোমান, জেএসডির আবদুল মালেক রতন, এলডিপির রেদোয়ান আহমেদ, তানিয়া রব, বিএনপির আমানউল্লাহ আমান।

আরো বক্তব্য রাখেন- ইসলামী ঐক্যজোটের অ্যাডভোকেট আবদুল লতিফ, খেলাফত মজলিসের ড. আহমেদ আবদুল কাদের, বিএনপির সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, ফজলুল হক মিলন, বিকল্পধারা বাংলাদেশ (একাংশ)- এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন ব্যাপারী, নাগরিক ঐক্যের এ এম আকরাম, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের হাবিবুর রহমান, জেএসডির এম এ গোফরান, বিএনপির হাবিবুর রশিদ হাবিব, আহসান উল্লাহ হাসান, সাইফুল আলম নীরব, আফরোজা আব্বাস, রাজীব আহসান।

দুপুর ২টায় সমাবেশ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এর আগেই খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে জনসভাস্থলে আসতে থাকেন নেতাকর্মীরা। দুপুর পৌঁনে ২টার দিকে পবিত্র কোরআন তেলওয়াতের মাধ্যমে জনসভার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। এদিকে নেতাকর্মীদের উপস্থিতিও বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে তা সোহারাওয়ার্দী উদ্যান ছাপিয়ে পাশের রাস্তা, রমনা পার্ক ও সেগুনবাগিচা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে ওই এলাকায় ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়।

জনসভাকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকা ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে যায়। এসব ব্যানার-ফেস্টুনে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 + 13 =