রাজনীতির আদর্শিক পরিবর্তন এবং জোটের ভবিষ্যৎ

ড. প্রণব কুমার পান্ডে: সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জোটের হিসাব নিকাশ। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের আবির্ভাবের পর থেকে আনেক জল গড়িয়েছে। ডাঃ বি. চৌধুরীর নেতৃত্বে বিকল্প ধারা বাংলাদেশ প্রথম দিকে জোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে আবির্ভূত হলেও কয়েকদিনের মধ্যে ড. কামাল হেসেনের সঙ্গে ডাঃ চৌধুরীর মত বিরোধ জনসম্মুখে চলে আসে। এই মতের অমিলের মূল কারণ জামাতের ব্যাপারে বিএনপি মতামত স্পষ্ট না করে জোটে অংশগ্রহণ এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার জন্য আসন ভাগাভাগির ব্যাপারে মতানৈক্য। যদিও বিকল্প ধারার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে তাদেরকে জোটের বাইরে রাখা ছিল একটি বিরাট ষড়যন্ত্রের অংশ।

বিরোধী পক্ষের জোটের মধ্যে চলছে ভাঙ্গা-গড়া খেলা। এরই মধ্যে বিএনপি সংস্কারপন্থীদের দলে ফিরিয়ে নিয়েছে আন্দোলন বেগবান করার জন্য। অন্যদিকে, শমসের মোবিন চৌধুরীসহ বিএনপির কয়েকজন নেতা বিকল্প ধারায় যোগদান করেছেন। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের জোটে অংশগ্রহণের জন্য বেশ কয়েকটি ছোট ছোট রাজনৈতিক দল আগ্রহ প্রকাশ করেছে। জোটের রাজনীতির মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- এই পরিবর্তন কেন দেখা যাচ্ছে এবং আগামী নির্বাচনে এর প্রভাব কী হবে?

জোটের রাজনীতি আলোচনায় আসলেও প্রকৃত পক্ষে সকলের দৃষ্টি রয়েছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দিকে। বিএনপির সাম্প্রতিক সময়ের বেশ কিছু কার্যক্রম দেশবাসীকে ভাবিয়ে তুলেছে বলে আমি মনে করি। আমরা সকলেই জানি, বিএনপি ছাড়া জোটের অন্যান্য দলের ভোটের রাজনীতিতে তেমন প্রভাব নেই। কারণ এই দলগুলোকে প্রায় সবগুলোই নামসর্বস্ব দল। কিন্তু, এই নামসর্বস্ব দলগুলোর সাথে বিএনপির জোট করার বিষয়টি বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। প্রথমত, জিয়া অরফানেজ ট্রাষ্ট মামলায় বেগম খালেদা জিয়ার জেল হওয়া এবং তারেক জিয়ার ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় সাজা হওয়ার ফলে বিএনপি রাজনীতির মাঠে আনেকটা পিছিয়ে গেছে একথা সকলেই স্বীকার করবেন। নির্বাচনের কয়েকমাস আগে দলের চেয়ারপার্সনের অনুপস্থিতি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সনের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মতো মামলায় দোষী সাবস্ত্য হওয়া যে কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য খুবই বিব্রতকর। তাছাড়া, তারেক জিয়া সম্পর্কে মানুষের মধ্যে যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বিএনপি এমন একটি প্লাটফর্মের খোঁজ করছিল যেটি প্রগতিশীল ধারাকে প্রতিনিধিত্ব করবে। সেই দিক থেকে ড. কামাল হোসেনের রয়েছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি। তিনি বাংলাদেশের একজন প্রতিথযশা আইনজ্ঞ শুধু নন, তিনি বাংলাদেশের সংবিধানের প্রণেতাদের মধ্যে অন্যতম। তাছাড়া, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা ছাড়া বিএনপির অন্য কোনো বিকল্প নেই। ফলে, তারা ড. কামালের অবস্থানকে ব্যবহার করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চায়।

দ্বিতীয়ত, যুক্তফ্রন্টে যোগদানের চেয়েও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিএনপির রাজনীতির ভাবাদর্শগত পরিবর্তন। আমরা যদি যুক্তফ্রন্টের সিলেটের জনসভার বিষয়টি আলোচনায় নিয়ে আসি তাহলে দেখা যাবে যে, কয়েকটি ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা সেখানে ঘটেছে। যদিও সভাটি যুক্তফ্রন্টের নামে আয়োজন করা হয়েছিল কিন্তু একটি বিষয়ে সকলে একমত হবেন যে, জনসভায় অংশ নেয়া জনসমষ্টির অধিকাংশই বিএনপির সমর্থক। অথচ, সেই জনসভায় কোরান তেলোয়াতের পরে গীতা পাঠও করা হয়েছে। এই বিষয়টি অবশ্যই আলোচনার দাবি রাখে। আরেকটি বিষয় আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে সেটি হলো, এই জনসভায় ড. কামাল হোসেন অনেকবার বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করেছেন। ড. কামাল হোসেনের মতো সুলতান মনসুর আহমেদও একই রকমভাবে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করেছেন। এই সময় মির্জা ফকরুলসহ বিএনপির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ পাশে বসে কথাগুলো শুনছিলেন। আমার ভাবতেই অবাক লাগে জিয়াউর রহমানের আদর্শ লালন করা রাজনৈতিক দল জিয়াউর রহমানের পরিবর্তে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ লালনকারীদের সাথে একসঙ্গে নির্বাচনী জোট বাধতে বাধ্য হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, বিএনপির মতো একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল কেন এই ধরনের জোটের অন্তর্ভূক্ত হলো এবং এই জোটবদ্ধতার প্রভাব কী হতে পারে আগামী নির্বাচনে? এই বিষয়টি বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। অনেকে মনে করছেন, বিএনপির দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় তারা নিজেদের ভাবাদর্শে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছে। আবার আনেকে মনে করেন যে, এটি একটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের ফসল যারা ড. কামাল হোসেনের খ্যাতি কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চায়। তবে, আমি মনে করি বিএনপির এই ধরনের সিদ্ধান্তের পেছনে অনেক বড় ষড়যন্ত্র রয়েছে। ইতিমধ্যে আমরা ব্যারিষ্টার মইনুল আহমেদের ফোনালাপ শুনেছি। যেখানে তিনি বলেছেন- তারেক জিয়াকে নেতৃত্ব থেকে সরানোর জন্য ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে এসেছেন। অর্থাৎ বিএনপির এই ধরনের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জিয়া পরিবারের আধিপত্য খর্ব হবে- বিষয়টি মোটামুটি সবাই মেনে নেবেন বলে আমি বিশ্বাস করি। তাছাড়া, গত কয়েক দিন বিএনপি সংস্কারপন্থীদের দলে ফিরিয়ে নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তটিও একই সূত্রে গাঁথা বলে আমার মনে হয়।

তবে, এই জোটের নির্বাচনী প্রভাব কেমন হবে সেটা নিয়ে আমার যথেষ্ঠ সন্দেহ রয়েছে। কারণ, বিএনপি বাদে ২০ দলের অন্যান্য শরীক ও জোটের আন্যান্য শরীকগুলো নামসর্বস্ব রাজনৈতিক দল যাদের ভোটের রাজনীতিতে কোন প্রভাব নেই। তাছাড়া, ইতিমধ্যেই আমরা লক্ষ্য করেছি যে, জোটের নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন ইস্যুতে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। জোটের জন্য সবচেয়ে কঠিন সময় আসবে যখন আসন ভাগাভাগির বিষয়টি সামনে আসবে। জোটের দাবি অনুযায়ী অর্ধেক আসন ছেড়ে না দিলেও বিএনপিকে প্রায় একশ আসন জোটের প্রার্থীদের জন্য ছেড়ে দিতে হবে। এই একশ আসনে বিএনপি বহু ত্যাগী নেতা রয়েছেন যারা গত দশ বছর জেল খেটেছেন এবং রাজনীতির কারণে বিভিন্ন ধরনের হয়রানির সম্মুখীন হয়েছেন। তৃনমূলের এই নেতৃবৃন্দ কি এই ধরনের আসন ভাগাভাগির বিষয়টি মেনে নেবেন? এটিই দেশবাসীর কাছে একটি বড় প্রশ্ন। যদি এই ধরনের সিদ্ধান্ত মেনে না নিয়ে সবাই বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন তাহলে বিএনপি’র কি পরিণত হবে সেটা খুব সহজেই অনুমান করা যায়।

এখানে যে আরেকটি বিষয় খুবই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার দাবি রাখে তা হলো, নির্বাচনের পদ্ধতি ও খালেদা জিয়ার মুক্তি। জোটের সাত দফার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন পরিচালনা। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হবে। তফসিল ঘোষণার এক সপ্তাহ আগেও বিএনপি সরকারের উপর এমন কোনো চাপ সৃষ্টি করতে পারে নি যাতে করে সরকার নির্বাচন কালীন সরকারের রুপরেখা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। তাছাড়া, এই সংসদের শেষ অধিবেশন ইতিমধ্যে সমাপ্ত হয়েছে। ফলে, নির্বাচনকালীন সরকারের রুপরেখা পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা আমি দেখি না। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরব থেকে ফিরে এসে যে সংবাদ সম্মেলন করেছেন সেখানে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন- বর্তমান সংবিধানের বিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে। অন্য দিকে, নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়ার মুক্তি হওয়ার সম্ভবনাও খুবই কম। এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- বিএনপি কি তাহলে খালেদা জিয়াকে কারা অন্তরীণ রেখে বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে? সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি নেতৃবৃন্দ যে ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন তা থেকে বোঝা যায় যে, তারা নির্বাচনের পুরোদম প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমার মনে হয় না বিএনপির পক্ষে শক্তিশালী আন্দোলনের মাধ্যমে নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায় করা সম্ভব। ফলে, নির্বাচনে অংশগ্রহণ ছাড়া তাদের আর কোনো বিকল্প আছে বলে আমি মনে করি না।

পরিশেষে বলা যায়, বিএনপি ও জোটের অন্যান্য শরীক দলগুলোর মধ্যে এক ধরণের আদর্শিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিএনপির জনসভায় যেমন ড. কামাল হোসেনসহ অন্য নেতৃবৃন্দ বঙ্গবন্ধুর কথা বলছেন যা বিএনপির নেতৃবৃন্দ মেনে নিচ্ছেন। অন্যদিকে ড. কামাল হোসেনসহ জোটের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আন্দোলন করছেন। উভয়ের জন্য এই বিষয়গুলো আদর্শিক পরিবর্তনের শামিল। এই আদর্শিক পরিবর্তন এবং জোট গঠন রাজনীতির জন্য একটি ইতিবাচক দিক বলে আমি মনে করি। এখন প্রশ্ন হলো- এই আদর্শকে বিসর্জন দিয়ে জোট নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করতে পারবে কি? যদি নির্বাচনে জিতেও যায় তাহলে জোট নেতারা এই আদর্শকে লালন করবেন, নাকি আবার তাদের পুরোনো আদর্শে ফিরে যাবেন- এটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপিসহ যুক্তফ্রন্টের নেতৃবৃন্দের পক্ষে আগামী নির্বাচনে বড় ধরণের কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে আমি মনে করি না।

লেখক: প্রফেসর, লোক প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seven − five =