পরিবহন ধর্মঘট : কী কারণে, কতটা প্রাসঙ্গিক?

আমরা বিংশ শতাব্দীর ক্ষমতায়ন পাড়ি দিয়ে একুশ শতকের ক্ষমতায়নে অগ্রসর হচ্ছি। শতাব্দীর ক্ষমতায়নে ডিজিটাল অগ্রযাত্রায় ধর্মঘট একটা চরম হতাশার কাণ্ড কারখানা। ৪৮ ঘণ্টা ধর্মঘট মানে রোববার সকাল ৬টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত। এভাবে দেশকে অচল করে রাখা দেশোদ্রহিতার লক্ষণ, বর্বরতা ও অসভ্যের প্রতীক।

এই ধর্মঘট অযৌক্তিক ও অবৈধ ধর্মঘট । এই ধর্মঘটকে পরোয়া না করে সবার উচিত নিজ নিজ কার্য সম্পাদন করা। দেশের জনগণ জীবনের নিরাপত্তায় শঙ্কিত। এক্ষেত্রে জনগণের পাশে সহযোগিতা পালনে পুলিশের অগ্রণী ভূমিকা রক্ষা অত্যাবশ্যকীয় কর্তব্য ।

নতুন পরিবহন আইনে বলা হয়েছে- চালকের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সহকারীর শিক্ষগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি পাস ও পঞ্চম শ্রেণি পাস৷ ব্যক্তিগত গাড়ির চালকের বয়স আগের নিয়মে ১৮ বছর বয়স এবং শুধু পেশাদার চালকের বয়স ২১ রাখা হয়েছে৷ ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে অনধিক ছয় মাসের জেল ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া হবে৷ এই দণ্ডের আসামিকে বিনা পরোয়ানায় পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারবে৷ সহকারীকেও ১ মাসের জেল ও ২৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান করা হয়েছে৷ আগের নিয়মে চালকের তিন মাসের জেল ও ২৫ হাজার টাকা জরিমানা ছিল৷ নতুন নিয়মে চালক মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবে না৷ এই আইন না মানলে কারাদণ্ডসহ ৫ হাজার টাকা জরিমানা হবে। বিধি অমান্য করলে চালকের পয়েন্ট কাটা যাবে। ১২টি পয়েন্ট দেওয়া হবে, পয়েন্ট শূন্য হয়ে গেলেই চালকের লাইসেন্স বাতিল হবে। নরহত্যা হলে ৩০২ ধারা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড। হত্যা না হলে ৩০৪ ধারা অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হবে। বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে মৃত্যু ঘটালে ৩০৪ (বি) ধারা অনুযায়ী তিন বছরের কারাদণ্ড হবে।

অপরদিকে পরিবহন শ্রমিকদের আট দফা দাবি হলো- সড়ক দুর্ঘটনায় মামলা জামিনযোগ্য করতে হবে। শ্রমিকদের অর্থদণ্ড ৫ লাখ টাকা করা যাবে না। সড়ক দুর্ঘটনা তদন্ত কমিটিতে শ্রমিক প্রতিনিধি রাখতে হবে। ড্রাইভিং লাইসেন্সে শিক্ষাগত যোগ্যতা পঞ্চম শ্রেণি করতে হবে। ওয়েস্কেলে (ট্রাক ওজন স্কেল) জরিমানা কমানোসহ শাস্তি বাতিল করতে হবে। সড়কে পুলিশের হয়রানি বন্ধ করতে হবে। গাড়ির রেজিস্ট্রেশনের সময় শ্রমিকদের নিয়োগপত্র সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সত্যায়িত স্বাক্ষর থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। সব জেলায় শ্রমিকদের ব্যাপক হারে প্রশিক্ষণ দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করতে হবে এবং লাইসেন্স ইস্যুর ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করতে হবে।

এক্ষত্রে সরকারের ওপর আস্থা রাখা উচিত ছিল শ্রমিক পরিবহন মালিক সমিতির। আমাদের দেশে মধ্যম আয়ের দেশ, সেই সঙ্গে উন্নয়নশীল একটা রাষ্ট্র। শিক্ষিতের হার ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে, অষ্টম শ্রেণি পাস আহামরি কিছু না, এটা জনজীবনের জন্যই হীতকর । আর যে জরিমানার কথা বলা হয়েছে, তা মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে খুবই নগণ্য। বয়সের দিকে তাকালে আগে যা ছিল ঠিক তাই আছ শুধু পেশাদার চালকের ক্ষেত্রে ২১ বছর করা হয়েছে।

অপরদিকে সরকারের উচিত জনগণের জন্য হীতকর ও যৌক্তিক দাবি দুটো- সড়কে পুলিশের হয়রানি বন্ধ আর সব জেলায় শ্রমিকদের ব্যাপক হারে প্রশিক্ষণ দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করতে হবে এবং লাইসেন্স ইস্যুর ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করার দাবি মেনে নেওয়া। অপরদিকে সমাবেশ করে দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরে আপোষে এসে ধর্মঘট তুলে দিয়ে জনসাধারণ ও দেশের মঙ্গলের কথা চিন্তা উচিত বলেই মনে করি।

পরিবহন শ্রমিকেরা জনজীবনকে জিম্মি করে দাবি আদায়ের যে চেষ্টা করছেন, তা অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাক্তন উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান।

তিনি আরো বলেন, জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকার জন্য শ্রমিকেরা আইন সংশোধনসহ এসব দাবি করছেন। এমন দাবির প্রতি সরকারের কোনোভাবেই সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত হবে না। অপরদিকে পরিবহন ধর্মঘটের মাধ্যমে তারা যাত্রীদের জিম্মি করছেন না বলে মনে করেন শ্রমিক পরিবহনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী। তার দাবি, শ্রমিকরা ‘গণতান্ত্রিক আন্দোলন’ করছেন।

তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার মামলা যদি জামিন অযোগ্য হয়, তাহলে তো পরিবহন শ্রমিকদের পক্ষে গাড়ি পরিচালনা করা সম্ভব না। আমরা এই আইন বাতিলের কথা বলি না, সংশোধনের কথা বলেছি।

তিনি আরো বলেন, ‘শুধু চালকের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে? রাস্তায় পথচারীর কারণে দুর্ঘটনা ঘটে, গাড়ির ব্রেক ফেল করলে দুর্ঘটনা ঘটে, রাস্তার পাশে হাট-বাজার বসলে দুর্ঘটনা ঘটে। আপনি তদন্ত করে যে দায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন। এককভাবে তো শুধু পরিবহন শ্রমিকরা দায়ী না।’

বাংলাদেশে অনেক অপরাধ আছে যেগুলো জামিন অযোগ্য। তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা আইনের ক্ষেত্রে এ বিধান থাকলে সমস্যা কোথায়? এমন প্রশ্নে ওসমান আলী বলেন, ‘আপনি ক্রিমিনাল ল’র (আইন) সড়ক দুর্ঘটনা মেলাবেন? সঙ্গে চালকদের দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রতিটি জেলায় ট্রেনিং সেন্টার স্থাপনের জন্য সরকার আগ্রহ দেখাচ্ছে না বলে তিনি অভিযোগ করেন।

প্রসঙ্গত, এর আগে গত ৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদে সদ্য পাস হওয়া সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনসহ সাত দফা দাবিতে পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের ডাকা ধর্মঘট শুরু হয়েছিল। ৯ অক্টোবর বিকেলে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের আশ্বাসে ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছিলেন ট্রাক পরিবহন শ্রমিকরা। কিন্তু ২৬ অক্টোবর কেরানীগঞ্জে ট্রাকচালক-শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক শ্রমিক নিহত হন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবার একই দাবি নিয়ে ফুঁসে উঠেছেন পরিবহন শ্রমিকরা। এরপরই এই ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়।

লেখক : কবি ও সাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

11 − 8 =