ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণে দেওয়া হয়েছে ৯৭০০ কোটি টাকা

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে গত ৫ অর্থবছরে মূলধন ঘাটতি পূরণে মোট নয় হাজার ৭০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরেও এ খাতে রাখা হয়েছে আরও দেড় হাজার কোটি টাকা। তবু এ ব্যাংকগুলোর অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে না। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের বোঝা বেড়েই চলেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ৫ অর্থবছরে মূলধন সহায়তা খাতে সবচেয়ে বেশি অর্থ দেওয়া হয়েছে সোনালী ব্যাংককে। রাষ্ট্রীয় মালিকানার সবচেয়ে বড় এই ব্যাংককে ৫ বছরে দেওয়া হয়েছে মোট ৩ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে দেওয়া হয়েছে একহাজার ৯৯৫ কোটি টাকা। ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে ৭১০ কোটি টাকা। ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে কোনো অর্থ দেওয়া হয়নি। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে দেওয়া হয়েছে ৭০০ কোটি টাকা। এবং গত ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে দেওয়া হয়েছে আরও ৪০০ কোটি টাকা। একইভাবে গত ৫ অর্থবছরে জনতা ব্যাংককে দেওয়া হয়েছে একহাজার ২১৪ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংককে একহাজার ৮১ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংককে ৬১০ কোটি টাকা। এবং বেসিক ব্যাংককে দেওয়া হয়েছে তিন হাজার ৩৯০ কোটি টাকা।

প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ মূলধন সহায়তা দিয়েও রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা ভালো করা সম্ভব হয়নি। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত বছরের জুন পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ, জনতা ব্যাংকের ২১ দশমিক ৫৬ শতাংশ, অগ্রণী ব্যাংকের ১৮ দশমিক ১৫ শতাংশ, রূপালী ব্যাংকের ২২ দশমিক ৬৪ শতাংশ, বেসিক ব্যাংকের ৫৭ দশমিক শূণ্য ৯ শতাংশ এবং বিডিবিএল’র ৫৫ দশমিক ১৫ শতাংশ।

বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ থাকার কারণে এই ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতিও বেড়ে গেছে। চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত জনতা, অগ্রণী ও বিডিবিএল- এই তিন ব্যাংকের কোনো প্রভিশন ঘাটতি না থাকলেও এ সময়ে সোনালী ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৫২০ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংকের ১ হাজার ৩৫১ কোটি টাকা এবং বেসিক ব্যাংকের ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ২২২ কোটি টাকা।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই ব্যাংকগুলোকে শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপির কাছ থেকে ঋণ আদায়ের একটি টার্গেট দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই টার্গেটের ধারে কাছেও ব্যাংকগুলো যেতে পারেনি। ছয় মাসে শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপির কাছ থেকে সোনালী ব্যাংক অর্থ আদায় করেছে টার্গেটের ৩ দশমিক ২২ শতাংশ। একইভাবে জনতা ব্যাংক ১৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ, অগ্রণী ব্যাংক শূণ্য দশমিক ৩৭ শতাংশ, রূপালী ব্যাংক শূণ্য দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং বেসিক ব্যাংক আদায় করেছে টার্গেটের শূণ্য দশমিক ৮৪ শতাংশ।

চলতি বছর রাষ্ট্র্রায়ত্ত ৫ ব্যাংককে ২০ জন বড় ঋণ খেলাপি বাদে অন্যান্য খেলাপির কাছ থেকে আদায়ের টার্গেট দেওয়া রয়েছে। এই টার্গেট অনুযায়ী এই ঋণ খেলাপিদের কাছ থেকে সোনালী ব্যাংকের আদায়ের টার্গেট এক হাজার ৯০০ কোটি টাকা। কিন্তু ছয় মাসে আদায় হয়েছে ১৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ, জনতার টার্গেট এক হাজার ১০০ কোটি টাকা। ছয় মাসে আদায় হয়েছে ২১ দশমিক ৫৪ শতাংশ। অগ্রণী ব্যাংকের টার্গেট ৮০০ কোটি টাকা। ছয় মাসে আদায় হয়েছে ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশ। রূপালী ব্যাংকের টার্গেট ৬০০ কোটি টাকা। ছয় মাসে আদায় হয়েছে মাত্র ১১ শতাংশ। এবং বেসিক ব্যাংকের আদায়ের টার্গেট রয়েছে ৭১৫ কোটি টাকা। ছয় মাসে আদায় হয়েছে ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ।

ঋণ আদায়ে রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকের আরও ব্যর্থতার পরিচয় পাওয়া গেছে, ঋণ অবলোপন থেকে আদায়ের পরিমাণ বিশ্লেষণ করে। এখানে ঋণ অবলোপন হচ্ছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো তাদের ব্যালেন্স শিট ভালো দেখানোর জন্য অনেক কু-ঋণ তাদের মূল হিসাব থেকে বাদ দিয়ে দেয়। এর ফলে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম দেখানো যায়। কিস্তু এরপরও ব্যাংকগুলো এই অবলোপনকৃত ঋণ আদায়ের চেষ্টা করে থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরে অবলোাপনকৃত ঋণ থেকে সোনালী ব্যাংকের আদায়ের টার্গেট ধরা রয়েছে একহাজার ৭৮ কোটি টাকা। এই হিসেবে ছয়মাসে (জুন পর্যন্ত) আদায় হওয়ার কথা ছিল ৫০০ কোটি টাকার কিছু বেশি। কিন্তু ছয় মাসে প্রকৃত আদায় হয়েছে মাত্র ২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। একইভাবে জনতা ব্যাংকের টার্গেট ৩২৮ কোটি টাকা। ছয় মাসে আদায় ১৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের টার্গেট ৮১০ কোটি টাকা, ছয় মাসে আদায় ৩৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এবং রূপালী ব্যাংকের টার্গেট ছিল ১৫৩ কোটি টাকা। ছয় মাসে আদায় হয়েছে মাত্র ২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।

খেলাপি ঋণ আদায়ে চরম ব্যর্থতার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূলধন ঘাটতি রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত যার পরিমাণ ৮ হাজার ৯ কোটি টাকা। এরপরই রয়েছে সোনালীর। এ সময় ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি ছিল ৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা। বেসিক ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৩ হাজার ১০৬ কোটি টাকা। জনতা ব্যাংকের ২ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। কিন্তু গত বছর একই সময় এই ব্যাংকের মূলধন উদ্বৃত্ত ছিল ১৭ কোটি টাকা। ছয়মাসে অগ্রণী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ১ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল ১ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen − 13 =