‘রাজনীতি মানেই কি বিরোধী দলের ওপর আক্রমণ’

রাজনীতি মানেই কি বিরোধী দলের ওপর পৈশাচিক আক্রমণ? শুধু আক্রমণই নয়, দলকে নেতৃত্ব শূন্য করার ঘৃণ্য অপচেষ্টা? রাজনীতিতে অবশ্যই ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যে শত বিরোধ থাকবে। তাই বলে বিরোধী দলকে নেতৃত্বশূন্য করার অপপ্রয়াস চালানো হবে? এটা কাম্য নয়।

আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২১ আগস্ট চালানো গ্রেনেড হামলা মামলার রায় বুধবার ঘোষণা করেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন। রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক এসব কথা বলেন।

বিচারক বলেন, ‘১৯৭১ সালে বাঙালী জাতি স্বাধীনতা অর্জন করে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে, রক্ত ও মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে। আইনের শাসন, গণতন্ত্র ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য জাতি একটি সংবিধান প্রনয়ণ করতে সক্ষম হয়। ১৯৭১ এর পরাজিত শক্তি, এদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ব্যাহত করার অপচেষ্টা চালাতে থাকে। পরাজিত শক্তি বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে স্বাধীন বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিকে রোধ করে। অগ্রগতির চাকাকে পেছনে ঘোরানোর চেষ্টা চালিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি ও লাল সবুজ পতাকাকে হেয় করার অপচেষ্টা চালায়। পরাজিত শক্তি ঐক্যবদ্ধভাবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। বিচার না হওয়ার অপচেষ্টা চালানো হয়। ইনডেমনিটি বিলের মাধ্যমে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র দেশে শুরু হয়।’

তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ২৩ বছর ২ মাস পর জাতির পিতা হত্যার দায় হতে জাতি কলঙ্ক মুক্ত হয় বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার পর চার জাতীয় নেতাকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়। তারপরও ষড়যন্ত্র থেমে না গিয়ে বহমান থাকে। পরবর্তী সময়ে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার হীন চেষ্টা চালানো হয়। ‘শেখ হাসিনাকে হালকা নাস্তা করানো হবে’ এই উদ্ধৃতি দিয়ে দেশীয় জঙ্গি সংগঠনের কতিপয় সদস্য আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় হামলা করে। তৎকালীন রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের সহায়তায় প্রকাশ্য দিবালোকে ঘটনাস্থল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে যুদ্ধে ব্যবহৃত স্পেশালাইজড মরণাস্ত্র, আর্জেস গ্রেনেড বিস্ফোরণের মাধ্যমে ঘটনা ঘটানো হয়। প্রশ্ন ওঠে, কেন এই মরণাস্ত্রের ব্যবহার? রাজনীতি মানেই কি বিরোধী দলের ওপর পৈশাচিক আক্রমণ? শুধু আক্রমণই নয়, দলকে নেতৃত্ব শূন্য করার ঘৃণ্য অপচেষ্টা। রাজনীতিতে অবশ্যই ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যে শত বিরোধ থাকবে। তাই বলে বিরোধী দলকে নেতৃত্বশূন্য করার প্রয়াস চালানো হবে? এটা কাম্য নয়।’

বিচারক পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতায় যে দলই থাকবে, বিরোধী দলের প্রতি তাদের উদার নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা থাকতে হবে। বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দকে হত্যা করে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক ফায়দা অর্জন মোটেই গণতান্ত্রিক চিন্তার বহি:প্রকাশ নয়। সাধারণ জনগণ এ রাজনীতি চায় না। সাধারণ জনগণ চায়, যে কোন রাজনৈতিক দলের সভা, সমাবেশ যোগ দিয়ে সেই দলের নীতি, আদর্শ ও পরিকল্পনা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান ধারণ করা। আর সেই সভা সমাবেশে আর্জেস গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটিয়ে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ জনগণকে হত্যার এ ধারা চালু থাকলে পরবর্তী সময়ে দেশের সাধারণ জনগণ রাজনীতি বিমুখ হয়ে পড়বে। আদালত চায় না সিলেটে হযরত শাহ জালাল (র:)- এর দরগা শরীফের ঘটনার, প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী এস এম কিবরিয়ার ওপর নৃশংস হামলার, রমনার বটমূলে সংঘটিত বোমা হামলার এবং অত্র মোকাদ্দমার ঘটনায় তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর নৃশংস ও বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলার পুনরাবৃত্তি।’

উল্লেখ্য, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে প্রাক্তন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া এ মামলার অপর ১১ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twenty + fourteen =