মধুর জয়ে ফাইনালে বাংলাদেশ

‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর, ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড়, তোরা সব জয়ধ্বনি কর’- কাজী নজরুল ইসলামের অমর কবিতার মতোই জয়ধ্বনি করে ফেলল বাংলাদেশ। ইতিহাসের অমর পাতায় অক্ষয় কালিতে নিজেদের নাম লিখে ফেলল মাশরাফি বিন মর্তুজার দল। বাংলাদেশের ক্রিকেট রূপকথায় যোগ হলো আরেকটি নতুন অধ্যায়।

২০১২ সালে ঘরের মাঠে পাকিস্তানের কাছে ২ রানের হারে এশিয়া কাপের শিরোপা হারিয়েছিল বাংলাদেশ। হারের সেই বেদনা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন ক্রিকেটাররা। সেই বেদনা কমানোর সুযোগ পেল এবার। ১৪তম এশিয়া কাপের ফাইনালে বাংলাদেশ। আর ফাইনালের সুযোগটি এসেছে পাকিস্তানকে হারিয়ে। পাকিস্তানকে হারানোর সুখস্মৃতি এর আগেও পেয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু ওদের মাটিতে হারানোর স্মৃতি নেই। আবার পাকিস্তানকে বিদায় করার স্মৃতিও কম। তাই এবার আবুধাবিতে দ্বিগুণ আনন্দ পেল টাইগাররা। প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালের পর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাই পাকিস্তানের হোম ভেন্যু।

টপ অর্ডারে হতশ্রী ব্যাটিংয়ের পর মিডল অর্ডারে দারুণ লড়াই। শেষ দিকে আবার বিবর্ণ ব্যাটিং। স্কোরবোর্ড রঙিন হওয়ার সুযোগ ছিল, হয়নি। তবুও আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরেনি। লড়াকু পুঁজি নিয়ে বোলাররা ব্যবধান গড়ে দিয়েছে। দারুণ জয়ে তৃতীয়বারের মতো এশিয়া কাপের ফাইনালে বাংলাদেশ। পারফরম্যান্সের ওঠা-নামা থাকলেও বিধাতার পরম মায়ায় শেষ হাসিটা হেসেছে বাংলাদেশ।

টস জিতে ব্যাটিংয়ে নেমে ৭ বল আগে শেষ হয় বাংলাদেশের ইনিংস। স্কোরবোর্ডে ২৩৯ রানের পুঁজি। লড়াকু বাংলাদেশ এ পুঁজি নিয়েই দাপট দেখাল। ২০২ রানের বেশি করতে পারল না চ্যাম্পিয়নস ট্রফির বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। বাংলাদেশ পাকিস্তানকে হারাল ৩৭ রানে।

আবুধাবিতে টসের আগেই বাংলাদেশ শিবির বড় ধাক্কা হজম করে। দেশে ফেরার বিমান ধরবেন বলে সাকিব আল হাসান টিম বাসেই চড়েননি!  সাড়ে তিনটায় খেলা শুরু, চারটায় সাকিবের ফ্লাইট। আঙুলের পুরনো চোটে নেই সাকিব। আঙুল ফুলে যাওয়ায় ব্যাট ধরতে কষ্ট হচ্ছিল তার। টসের আগের ধাক্কা হজম হতে না হতেই ব্যাটিংয়ে নেমে টপ অর্ডার ভেঙে পড়ার ধাক্কা! ১২ রান তুলতেই নেই ৩ উইকেট।

শুরুটা খুলনা থেকে ঢাকা হয়ে দুবাই যাওয়া সৌম্য সরকারকে দিয়ে। নাজমুল হোসেন শান্তর পরিবর্তে আজ তার সুযোগ আসবে, তা আগেই জেনেছিলেন। প্রস্তুতির যথেষ্ট সময়ও পেয়েছিলেন। কিন্তু কিসের কি! নিজের ইচ্ছেমতো বাজে শট খেলে আউট হয়েছেন শূন্য রানে। জুনায়েদের শর্ট বলে পুল করতে গিয়ে ফখরের হাতে ক্যাচ দেন।

সাকিবের পরিবর্তে সুযোগ পাওয়া মুমিনুল হক তিনে ব্যাটিংয়ে নেমে অসাধারণ অন ড্রাইভে বাউন্ডারির খাতা খোলেন। শাহীন আফ্রিদির পায়ের ওপরের বলে বাউন্ডারি মেরে ভালো কিছুর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু বাঁহাতি এ পেসার এক বল পরই প্রতিশোধ নেন। ভেতরে ঢোকা বলে বোল্ড মুমিনুল।

পেসার জুনায়েদ আবার ধাক্কা দেন বাংলাদেশ শিবিরে। এবার তার শিকার লিটন। বারবার সুযোগ পাওয়া লিটন জুনায়েদের পেসে বল মিস করে বোল্ড হন ৬ রানে। টপ অর্ডারের সব দায়িত্ব শেষ ৪.২ ওভারে। তখনো ইনিংসের বাকি ২৭৪ বল। হতশ্রী ব্যাটিংয়ে বড় স্কোরের স্বপ্ন ভেস্তে যায় শুরুতেই।

দলকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তোলার দায়িত্বটা আবার পড়ে মুশফিকের কাঁধে। পাঁজরের ব্যথা আর বুকে টেপ পরে খেলতে নামা মুশফিকের এ আরেক পরীক্ষা। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচে সেঞ্চুরি তুলে দলকে জিতিয়েছিলেন। এবারও খেললেন আরেকটি বিরোচিত ইনিংস। মুশফিক আজও বুক চিতিয়ে লড়াই করেছেন। দৃঢ় মনোবল থাকলে যে বড় কিছু পাওয়া যায়, তার আরেকটি প্রমাণ পেল ক্রিকেট বিশ্ব।

তবে আক্ষেপ থাকতে পারে দলের সেরা ব্যাটসম্যানের। মাত্র ১ রানের জন্য ক্যারিয়ারের সপ্তম সেঞ্চুরির স্বাদ পাননি। আউট হয়েছেন ৯৯ রানে। বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আউট হয়েছেন ৯৯ রানে। চতুর্থ উইকেটে মুশফিককে সঙ্গ দেন মোহাম্মদ মিথুন। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এ দুজন চতুর্থ উইকেট জুটিতে ১৩১ রান যোগ করে দলকে বাঁচিয়েছিলেন। আজ জুটিটা হলো ১৪৪ রানের। পাকিস্তানের বিপক্ষে রেকর্ড রানের জুটি। এক-দুই রান করে উইকেটে থিতু হয়েছেন। পরবর্তীতে বাউন্ডারিতে রানের চাকা ঘুরিয়েছেন ।

মিথুনও এবারের এশিয়া কাপের দ্বিতীয় হাফ সেঞ্চুরি তুলে বড় কিছুর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু নিজের ভুলে ইনিংস বড় করতে পারেননি। ৩৪তম ওভারে হাসান আলীকে তুলে মারতে গিয়ে উইকেট উপহার দেন। প্রথম ম্যাচে মালিঙ্গাকে যেভাবে উইকেট উপহার দিয়েছিলেন, এবারও সেটার রিপ্লে করেছেন। সাজঘরে ফেরার আগে ৮৪ বলে ৪ বাউন্ডারিতে করেন ৬০ রান।

মিথুন ফিরলেও বাংলাদেশ তখনো বড় সংগ্রহের পথে ছিল। কিন্তু সব ওলটপালট হয়ে যায় ইমরুলের বিদায়ে। লেগ স্পিনার শাদাব খানের বলে ইমরুল এলবিডব্লিউ হন ৯ রানে। তিন অঙ্কের পথে থাকা মুশফিক একপ্রান্তে খেলে যাচ্ছিলেন। সেঞ্চুরির পর ঝড় তুলবেন এমনই পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু বিধাতা মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় সেটাও হয়নি। তার লড়াইয়ের সমাপ্তি হলো বড় আফসোস নিয়ে। মুশফিক ফিরলেন ৯৯ রানে! পেসার শাহীন শাহ আফ্রিদিকে বাউন্ডারি মেরে ৯৫ থেকে ৯৯-এ পৌঁছেছিলেন। পরের বল ডট। পরের বলে অন ড্রাইভ খেলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ব্যাটের স্পর্শ পেয়ে বল যায় সরফরাজের হাতে। ১১৬ বলে ৯ বাউন্ডারিতে শেষ মুশফিকের ইনিংস।

বাংলাদেশের শেষ ভরসা ছিলেন মাহমুদউল্লাহ। কিন্তু সাতে নামা মাহমুদউল্লাহর ব্যাট আজ হাসেনি, ঝড়ও ওঠেনি। ৩১ বলে ১ বাউন্ডারিতে করেছেন ২৫ রান। মাশরাফির ১৩ ও মুশফিকের ১২ রানে ২৩৯ রানের পুঁজি পায় বাংলাদেশ।

শেষ দিকে বাংলাদেশের ব্যাটিং ছিল বিবর্ণ। ৩০ ওভারে ৩ উইকেটে ১৩৮ রান থাকা বাংলাদেশ পরের ১৯ ওভারে তুলেছে ১০১ রান। হারিয়েছে ৭ উইকেট। আর ৪০ থেকে ৪৯ ওভার পর্যন্ত যেতে বাংলাদেশ তুলেছে মাত্র ৫২ রান, হারিয়েছে ৫ উইকেট। তবে হতশ্রী শুরুর পর যে পুঁজি পেয়েছিল, তাতে মুখে কিছুটা হলেও হাসি ফুটেছিল।

মোহাম্মদ আমিরের বাজে ফর্মে প্রথমবারের মতো সুযোগ পেয়ে জুনায়েদ খান দ্যুতি ছড়িয়েছেন। ১৯ রানে নিয়েছেন ৪ উইকেট। হাসান আলী ও শাহীন আফ্রিদি পেয়েছেন ২টি করে উইকেট।

স্বল্প পুঁজি নিয়ে জয়ের জন্য শুরুতেই উইকেটের প্রয়োজন ছিল। কাজের কাজটা করে দেন মুস্তাফিজ ও মিরাজ। প্রথম ওভারে মিরাজের বলে এগিয়ে এসে রুবেলের দুর্দান্ত ক্যাচে পরিণত হন ফখর জামান। মুস্তাফিজ প্রথম ওভারেই ফেরান বাবর আজমকে। মুস্তাফিজের ভেতরে ঢোকানো বলে এলবিডব্লিউ বাবর। এরপর বাঁহাতি এ পেসারের বলে মুশফিকের ক্যাচে পরিণত হন সরফরাজ।

১৮ রান তুলতেই ৩ উইকেট নেই পাকিস্তানের। ওই রানেই আররো একটি উইকেট তুলে নেওয়ার সুযোগ এসেছিল। মুস্তাফিজের বলে মিড অফে পাঠিয়ে দৌড় দিয়েছিলেন শোয়েব মালিক। তার ডাকে সাড়া দেননি ইমাম। তখন একই প্রান্তে দুই ব্যাটসম্যান। কিন্তু বল তালুবন্দি করতে ব্যর্থ মাহমুদউল্লাহ। বেঁচে যান মালিক।

আর সেখান থেকেই লড়াই শুরু তার। তাকে সঙ্গ দেন ইমাম। দুজনের ১০০ বলে ৬৭ রানের জুটি মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায় বাংলাদেশের। ভালো বোলিংয়েও ভাঙছিল না জুটি। আক্রমণে না গিয়ে এক-দুই রানে ইনিংস বড় করছিলেন তারা। এ জুটি ভাঙার জন্য প্রয়োজন ছিল বিশেষ কিছু। এগিয়ে আসলেন অধিনায়ক মাশরাফি।

রুবেলের ওভারপিচ বল মিড উইকেটে খেলতে চেয়েছিলেন মালিক। ব্যাটে-বলে করেছিলেন ঠিকমতো। কিন্তু ওখানে ছিলেন ‘সুপারম্যান’ মাশরাফি। বাঁদিকে ঝাঁপিয়ে একহাতে বল তালুবন্দি করে পুরো বাংলাদেশকে উল্লাসে ভাসান মাশরাফি। তাতেই যেন সব পাওয়া হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের।

জয়ের পাল্লা ভারী হতে থাকে বাংলাদেশের। সৌম্য শাদাব খানকে ফেরালে জয়ের সম্ভাবনা আরো দৃঢ় হয়। ৯৫ রান তুলতেই অর্ধেক ব্যাটসম্যান সাজঘরে। ষষ্ঠ উইকেটে প্রতিরোধ পায় পাকিস্তান। হাফ সেঞ্চুরির স্বাদ পাওয়া ইমামকে সঙ্গে দেন আসিফ। ৭১ রানের জুটি গড়েন তারা। মিরাজ ৪০তম ওভারে ভাঙেন এ জুটি। এরপর আর বাংলাদেশের জয় থামাতে পারেনি পাকিস্তান।

মিরাজের ঘূর্ণিতে স্টাম্পড হন আসিফ আলী। ২২ রানে লিটনের হাতে জীবন পাওয়া ডানহাতি ব্যাটসম্যান আউট হন ৩১ রানে। এরপর মাহমুদউল্লাহ স্টাম্পড করান ইমামকে (৮৩)। পরের ব্যাটসম্যানরা পরাজয়ের ব্যবধান কমিয়েছেন শুধু।

মুস্তাফিজ ৪৩ রানে নিয়েছেন ৪ উইকেট। মিরাজ পেয়েছেন ২ উইকেট। ১টি করে উইকেট সৌম্য, রুবেল ও মাহমুদউল্লাহর।

২০১৫ বিশ্বকাপের পর পাকিস্তানকে টানা চতুর্থ ওয়ানডেতে হারাল বাংলাদেশ। ঘরের মাঠে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশের পর এবার ওদের ‘মাটি’তেই হারাল। দলের দুই স্তম্ভ তামিম ও সাকিবকে ছাড়া আজ চার বছর পর খেলল বাংলাদেশ। যেভাবে মুশফিক, মুস্তাফিজ, মাশরাফিরা এগিয়ে এসে দায়িত্ব পালন করলেন, তা সত্যিই মনোমুগ্ধকর, অনিন্দ্য সুন্দর। এবার ভারত-বধের পালা। ২৮ সেপ্টেম্বর দুবাইয়ে বিগ ফাইনালে মুখোমুখি ভারত-বাংলাদেশ। এবার শিরোপার স্বপ্ন পূরণ হবে তো? হৃদয় জেতা হয়েছে অনেকবার, এবার শিরোপা জেতার পালা!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen + nine =