শুধু সিদ্ধান্ত গ্রহণ নয় বাস্তবায়নও প্রয়োজন

সড়ক-মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছে না কিছুতেই। ঈদুল আজহার আগে ও পরে সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহত হওয়ার ঘটনা যেন আরো বেড়েছে। কোনোভাবেই সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো যাচ্ছে না। নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনের পর পুলিশের ট্রাফিক সপ্তাহও শেষ হয়েছে। কিন্তু যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল থামছে না। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির হিসাব অনুযায়ী, গত ১৬ থেকে ২৮ আগস্ট পর্যন্ত ১৩ দিনে সারা দেশে ২৩৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৫৯ জন মানুষ মারা গেছেন, আহত হয়েছেন অন্তত ৯৬০ জন। আর ২৮ তারিখের পর গত কয়েকদিনে বিভিন্ন্ স্থানে আরো অন্তত ২০ জনের প্রাণহানি এবং আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

রাজধানীতে বিমানবন্দর সড়কে গত ২৯ জুলাই বেপরোয়া বাসের চাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নেমে এসেছিল। দেশের বিভিন্ন স্থানে এ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গত মাসে সড়ক পরিবহন আইন মন্ত্রিসভার অনুমোদন পায়। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে যানজটমুক্ত নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা জমা দিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নির্দেশও দেওয়া হয়। এর আগে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে গত জুনে ছয় দফা নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

কিন্তু সেসব কতটা বাস্তবায়ন বা কার্যকর হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। গত কয়েক দিনের সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র থেকে বলা যায় অবস্থা সেই প্রায় আগের মতোই। বেশি যাত্রী তোলা ও একই রুটের বাসের আগে যাওয়ার জন্য রেষারেষি বন্ধ হয়নি। মালিক-শ্রমিক নেতাদের ঘোষণাও মানছেন না অনেকে। ফলে এখনো চুক্তিতে চলছে অনেক বাস। শুধু তাই নয়, সড়কে এখনও চলছে লক্করঝক্কর মার্কা বাস। অনেক বাসের জানালা, সিগন্যাল লাইট নেই। আগের মতোই বাড়তি ভাড়াও আদায়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অবশ্য পুলিশের তৎপরতা আগের চেয়ে বেড়েছে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিভিন্ন পয়েন্টে চেকপোস্ট বসিয়ে যানবাহনের ফিটনেস সনদ, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও রুট পারমিট পরীক্ষা করতে দেখা গেছে পুলিশকে।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকালে সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল সড়ক দুর্ঘটনা রোধে যা যা করা দরকার তার সবকিছুই করা হবে। সে প্রতিশ্রুতি পূরণের অংশ হিসেবে রাজধানীসহ সারা দেশের সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে গত ২৭ আগস্ট সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা পরিষদের সভায় ১৮টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এসব সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের ওপরও জোর দেওয়া হয়।

মহাসড়কে ৮০ কিলোমিটার গতির ওপরে যানবাহন চালানোর ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ঢাকায় বাসগুলোর প্রতিযোগিতা বন্ধে চুক্তিভিত্তিক চলাচল বন্ধ করার আগের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে হবে। মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বাস, ট্রাক চালকদের জন্য বিশ্রামাগার স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া মহাসড়ক থেকে নসিমন, করিমন, ভটভটি, অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত যানবাহন চলাচল বন্ধে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

বস্তুতঃ সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিভিন্ন সময় নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বা নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সেসব সিদ্ধান্ত যেন কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকছে। কিন্তু শুধু সিদ্ধান্ত গ্রহণ নয় যথাযথভাবে তার বাস্তবায়নও কাম্য। বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া যানবাহন চালানো অপরাধ। এ জন্য জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু হাজার হাজার অদক্ষ চালক ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই যানবাহন চালাচ্ছেন। এ জন্য কারও শাস্তি কিংবা জেল-জরিমানা হয়েছে, এমন দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে। বিচার ও শাস্তি হয় না বলে বেপরোয়া চালকদের দৌরাত্ম্যও কমছে না।

সড়ক দুর্ঘটনায় শুধু অমূল্য প্রাণ ঝরে যাচ্ছে তা নয়। যারা আহত হয়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হারাচ্ছে, কর্মক্ষমতা হারিয়ে পরিবারের বোঝায় পরিণত হচ্ছে, তাদের জীবনতো আরো দুর্বিসহ। গত শুক্রবার যাত্রীকল্যাণ সমিতি সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে কিছু বিষয় তুলে ধরেছে। ফিটনেসবিহীন যানবাহনের অবাধে চলাচল, অদক্ষ, লাইসেন্সবিহীন চালকের বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চালানো, পণ্যবাহী যানবাহনেও বিপজ্জনকভাবে যাত্রী পরিবহনকে তারা সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। বিভিন্ন সময় বিশেষজ্ঞরাও প্রায় একই ধরনের কারণের কথা বলেছেন।

দুর্ঘটনার এসব কারণ দূর করা মোটেও কঠিন কিছু নয়। প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন, সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও কর্মকর্তাদের যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করা। তা না করলে জবাবদিহি ও শাস্তির ব্যবস্থা থাকা জরুরি। তাই আমাদের প্রত্যাশা এবার শুধু সিদ্ধান্ত নেওয়া নয় তার বাস্তবায়নকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে। সড়কে মৃত্যুর মিছিল বন্ধ করতে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে সংশ্লিষ্ট সবাইকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × 1 =