রাজপথে নৈরাজ্য কেন কমে না?

অবশেষে হাতে-কলমে বিষয়টির প্রমাণ মিলল। আমাদের ঘুমন্ত বিবেক সহজে জাগে না। নিদ্রিত বোধের ঘুম সহজে ভাঙে না। যদিওবা ভাঙে, খানিকক্ষণ জেগে থেকে আবার নেতিয়ে পড়ে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যে চপেটাঘাত করেছে, তারপরও কেন আমরা শুধরে গেলাম না? রাজধানীর সড়কে যে শৃঙ্খলা ফেরার কথা ছিল তা আদৌ ফেরেনি। যদিও ঈদের আমেজ এখনও পুরোপুরি কাটেনি। ফলে রাজপথ শান্ত এবং সহনীয়। কিন্তু দু’দিন পরেই রাজধানী ফিরে যাবে তার পুরনো চেহারায়। রাজপথে নৈরাজ্য চলবে সেই আগের মতোই।

ঢাকা মহানগরের সড়কে অনিয়ম করাটাই যেন নিয়মে পরিনত হয়েছে। নিয়ম আছে নিয়মের জায়গায়, হয়ত শুধুই খাতা-কলমে। বাস্তবে সড়কে নিয়ম অমান্য চলছেই। চালকরা বরাবরই বেপরোয়া, নিয়মের বেড়াজাল তাদের না-পছন্দ। অনেকের ঢালাও অভিযোগ, শৃঙ্খলার শৃঙ্খল ভাঙতেই তারা বেশি তৎপর। অন্যদিকে, পথচারীরাও নিয়ম অমান্য করায় মোটেও পিছিয়ে নেই। হালের অবস্থা দেখে কে বলবে, কদিন আগেও রাজধানীজুড়ে অন্যরকম চিত্র ছিল। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলাকালে নিয়ম মানার প্রবণতা ছিল ঢাকা মহানগরের সবখানে। অথচ এখন সেই প্রবণতা উধাও। ভাবখানা এমন, আন্দোলন শেষ, তো নিয়ম মানাও শেষ। নগরবাসীর এই আচরণে সত্যি অবাক হতে হয়।

পুলিশের বিশেষ ট্রাফিক সপ্তাহ ঈদের আগে চলেছে। বিআরটিএ বিশেষ অভিযানও চালাচ্ছে। তারপরও অবস্থার উন্নতি খুবই সামান্য। আগের মতোই যততত্র যাত্রী নামছে, উঠছে। বেশি যাত্রী তোলা নিয়ে দুই বাসের পাল্লা চলছে। পথচারীরা ইচ্ছে-স্বাধীন যততত্র রাস্তা পার হচ্ছেন। উল্টো পথে গাড়ি চালানোও থেমে নেই। মুঠোফোন ব্যবহার করতে করতে গাড়ি চালচ্ছেন চালকরা। পথচারীরা রাস্তা পার হচ্ছেন মুঠোফোনে কথা বলতে বলতে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে আমরা কোনো শিক্ষাই গ্রহণ করলাম না! কোথায় গেল ইমারজেন্সি লেন? কোথায় হারাল সারিবদ্ধ চলাচল? কেন সড়কে এই সীমাহীন নৈরাজ্য? মোটা দাগে বলতে গেলে, পদে পদে ট্রাফিক আইন অমান্যের প্রতিযোগিতাই এজন্য দায়ী। আরেকটু গভীরে গেলে মিলবে আরও তথ্য। নেপথ্য কারণের কয়েকটি তাহলে উল্লেখ করা যাক :

১. মাসোয়ারা পদ্ধতিতে চলাচল অযোগ্য হাজার হাজার গাড়ি অবাধে সড়কে নামার সুযোগ করে দেওয়া।

২. বিভিন্ন গতির গাড়ি একই লেনে চলাচল করা। দেখা যায়, অল্প গতির গাড়ির পেছনে দীর্ঘসময় আটকে থাকে দ্রুত গতির গাড়ি। সেইসঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত রিকশা চলাচলের ঝক্কি তো আছেই।

৩. ট্রিপভিত্তিক মুনাফা ভাগাভাগি। ঢাকায় অধিকাংশ বাস মালিক তাদের অধীনস্থ চালক ও হেলপারদের বেতন দেন না। বরং প্রতি ট্রিপের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা নেন। সেই টাকা পরিশোধের পর বাড়তি যে টাকা থাকে সেটাই নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন চালক ও হেলপাররা। তাই আয় বাড়াতে বেশি যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতায় নামে তারা। বেপরোয়া বাস চালান চালকরা।

৪. ঝুঁকি নিয়ে যততত্র পথচারীদের রাস্তা পারাপার। তাদের আন্ডারপাস ও ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করার প্রবনতা।

৫. সড়কে যথেচ্ছ পার্কিং। ফলে সৃষ্টি হয় যানজট।

৬. আইন প্রয়োগে সংশ্লিষ্টদের দুর্বলতা।

৭. বিআরটিএর সক্ষমতার অভাব, পাশাপাশি দুষ্টু চক্রের দুর্নীতি।

৮. আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ফুটপাত দিয়ে মোটর সাইকেল চালনা।

তালিকা আরও লাম্বা করা যায়। আপতত এইটুকুই থাক। চলুন, এই ফাঁকে কিছু পরিসংখ্যান জেনে নেওয়া যাক। এক হিসাব মতে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৭৪ টি। নিহত হয়েছে ১৬৭ জন। প্রতি মাসে ঢাকা মহানগরীতে সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে মারা যায় ২৪ জন। বছরে গড়ে প্রায় ৩০০ জন। আর আহত হয় অনেক বেশি। আহতদের কথা তো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আলোচনায় আসেই না। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে যত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে তার প্রায় ২০ শতাংশ ঘটে খোদ এই রাজধানীতেই। আমরা স্বীকার করি, বা না করি, ঢাকা মহানগরীর সড়কগুলো কিন্তু দিনকে দিন বিপজ্জনক হয়ে পড়ছে। গত ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে চালকদের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় প্রাণ হারায় দিয়া ও রাজীব নামের দুই শিক্ষার্থী। আহত হয় ৯ জন। এ ঘটনার পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। টানা ৯ দিন আন্দোলনের পর সরকারের আশ্বাসে শ্রেণিকক্ষে ফিরে গেছে তারা। কিন্তু সড়কে কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা ফেরেনি। তড়িঘড়ি সড়ক পরিবহন আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হয়েছে। সংসদে পাস হলেই সেটি আইনে পরিণত হবে। বাস চলাচলের অনুমোদন প্রক্রিয়ার সংস্কারের দাবি এই আইনে উপেক্ষিত হয়েছে বলে অভিজ্ঞমহলের অনেকেই সমালোচনা করেছেন। দাবি ছিল ‘রুট ফ্রান্সাইজ’ পদ্ধতির। এই পদ্ধতিতে সব বাস-মিনিবাস কয়েকটি কোম্পানির অধীনে নিয়ে আসা হয় এবং কেন্দ্রীয় ভাবে সেটা পরিচালনা করা হয়। মালিকরা সবাই এর অধীনে বাস চালাবেন এবং বিনিয়োগ অনুসারে মুনাফা পাবেন। চালকরা পাবেন নিয়োগপত্র। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক এই ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। গুলশানে ‘ঢাকা চাকা’ পরিবহন এই পদ্ধতিতে চলছে বলেই সেখানে চালকদের মধ্যে পাল্লাপাল্লি নেই।

বিআরটিএর তথ্য মতে, রাজধানীতে ২৪৬টি কোম্পানির অধীনে বাস চলে ৮ হাজারের মতো। বাস মালিকের সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। সূত্র জানায়, প্রভাবশালী অনেকেই নিজে কোম্পানি খোলার পর দুই-একটি বাস কেনেন, তারপর অন্যদের কাছ থেকে ভাড়ায় বাস নিয়ে রুটে চালানো শুরু করেন। বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হকের অভিমত হলো, ‘বাস ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে হলে অবশ্যই ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালু করতে হবে। আর সিগন্যাল ব্যবস্থা কার্যকর করে মোড় দিয়ে পথচারীদের সড়ক পারাপারের ব্যবস্থা করতে হবে। মোড় দিয়ে পথচারীরা সড়ক পারাপার হবেন, এটাই প্রচলিত ও বৈজ্ঞানিক নিয়ম।’ চিত্রনায়ক ও নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের উদ্যোক্তা ইলিয়াস কাঞ্চন মনে করেন চালকদের মধ্যে কমপক্ষে তিনটি জিনিস থাকতে হবে। এক. চালককে দক্ষ হতে হবে, ন্যূনতম পর্যায়ে শিক্ষিত তো হতেই হবে। দুই. তাদের ট্রাফিক আইন সম্পর্কে জানতে হবে। তিন. সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

ট্রাফিক সপ্তাহ উপলক্ষে রাজধানীর বিভিন্ন পুলিশ বক্স থেকে সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার করা হয়েছে। আমরা সেগুলো দেখেছি। ‘খোকাবাবু যায়, হেলমেট কোথায়?’, ‘অযথা হর্ন বাজাবেন না’, ‘নির্ধারিত স্থান ছাড়া বাস থামাবেন না’, ‘যত্রতত্র রাস্তা পার হবেন না’, ‘চলন্ত গাড়িতে ওঠা-নামা করবেন না’ ইত্যাদি। আমরা আরো দেখলাম, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে যততত্র বাস থামিয়ে যাত্রী উঠানো বন্ধ করতে ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি কাজ করেছে স্কাউট সদস্যরা। তাদের এই তৎপরতা অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য। সড়ক ও পরিবহন বিটে কাজ করা এক সাংবাদিকের সঙ্গে কথা হলো রাজপথের নৈরাজ্য নিয়ে। তিনি বললেন, অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। বিশেষ করে যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং ও যাত্রী ওঠানামা চলছেই। উদাহরণ হিসেবে তিনি বললেন, আরামবাগ থেকে মতিঝিল ইডেন ভবন পর্যন্ত এলাকার কথা। সেখানে এখনও সড়কের ওপর অবৈধভাবে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন পরিবহনের বাস। এক সারি নয়, কোথাও কোথাও আবার দুই-তিন সারি। কথায় কথায় তিনি জানালেন, কী পরিমান ঝুঁকি নিয়ে এখনও পথচারীরা চলন্ত গাড়ির সামনে দিয়ে সড়ক পারাপার হচ্ছেন। একটু সময় বাঁচাতে গিয়ে নিজেদের জীবনকে কতটা ঝুঁকির মুখে ফেলছেন। আলাপের এক পর্যায়ে মুচকি হেসে তিনি বললেন, যে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করল, তাদের অনেকেও তো এখন ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে। কাছের ফুট ওভারব্রিজ বা আন্ডারপাস ব্যবহার করছে না। সায়েন্স ল্যাব মোড়সহ কয়েকটি জায়গায়ই এই চিত্র চোখে পড়েছে তার।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে দামি প্রশ্ন হলো : আমাদের মাঝে বোধ জেগে উঠবে কবে? নিজেকে বদলিয়ে আমরা কবে জেগে উঠব? নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ফলে একটা নৈতিক ভিত্তি গড়ে উঠেছে। তারা আমাদেরকে আলোর দিশা দেখিয়েছে। সবার মাঝে সচেতনতা বেড়েছে। পুলিশ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে চাইলেই দ্বিধাহীনভাবে সব জায়গায় হাত দিতে পারছে। চালক আর পথচারীদের এবার আইন মানার প্রবণতা বাড়াতে হবে। সবার মাঝে আইন মানার সংস্কৃতি যত তাড়াতাড়ি গড়ে উঠবে দেশের জন্য, দশের জন্য ততই মঙ্গল।

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যসেবক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

17 + twelve =