গর্ভবতী নারীদের বাম কাতে ঘুমানো ভালো কেন?

অনেক চিকিৎসক গর্ভবতী নারীদের বাম পাশ ফিরে ঘুমাতে পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু কেন? ডানপাশে কাত হয়ে ঘুমালে কিংবা চিৎ হয়ে ঘুমালে সমস্যা কোথায়?

গর্ভবতী নারীদের বাম কাত হয়ে ঘুমানোর মেডিক্যাল কারণ আবিষ্কার হয়েছে। যেহেতু গর্ভকালে ভ্রুণ দিনদিন বড় হতে থাকে, তাই এটি স্বাভাবিকভাবেই তার মায়ের অভ্যন্তরীণ অর্গান ও রক্তনালীতে বেশি থেকে বেশি চাপ ফেলে। বিকাশমান শিশু যখন মায়ের ব্লাডারে চাপড় মারে অথবা অন্ত্রে লাথি মারে, তখন গর্ভবতী নারী ব্যথা অনুভব করতে পারে। কিন্তু এই ধরনের অভিজ্ঞতা থেকে আপনাকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে বাম পাশ ফিরে ঘুমানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে না।

জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের ওষুধ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. গ্রেস পিয়েন বলেন, ‘মায়ের একটি বড় শিরা হচ্ছে ইনফেরিয়র ভিনা কাভা (আইভিসি), যা মেরুদণ্ডের ডানপাশ বরাবর গেছে এবং এটি শরীরের নিচের অংশ থেকে হৃদপিণ্ডে পুনরায় রক্ত বহনে অবদান রাখে।’

পিয়েন লাইভ সায়েন্সকে বলেন, ‘যদি গর্ভবতী নারী পিঠে ভর দিয়ে বা চিৎ হয়ে ঘুমায়, তাহলে ইনফেরিয়র ভিনা কাভায় ভ্রুণের চাপ পড়ার সম্ভাবনা বেশি, এর ফলে হৃদপিণ্ডের দিকে পুনরায় ফিরে যাওয়া রক্তের পরিমাণ হ্রাস পাবে।’ তিনি যোগ করেন, ‘বাম পাশ ও ডান পাশে কাত হয়ে ঘুমানো নিয়ে অনেক তুলনামূলক গবেষণা হয়েছে এবং এটা প্রমাণ হয়েছে যে বাম পাশে কাত হয়ে ঘুমালে ডান পাশে কাত হয়ে ঘুমানোর চেয়ে চাপ পড়ার সম্ভাবনা কম।’

কেন এই চাপ ভালো নয়? হৃদপিণ্ডে কম রক্ত প্রবেশ করার মানে হচ্ছে হৃদপিণ্ড থেকে কম রক্ত বের হওয়া, এর ফলে মায়ের রক্তচাপ কমে যায় এবং মা ও শিশু উভয়ের জন্য রক্তে অক্সিজেন কনটেন্টের পরিমাণ হ্রাস পায় (মায়ের রক্ত শিশুকে অক্সিজেন সরবরাহ করে)। পিয়েন বলেন, ‘অধিকাংশ সুস্থ গর্ভবতী নারী ও তাদের ভ্রুণ কার্ডিয়াক আউটপুট সামান্য হ্রাসের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠতে পারে, কিন্তু আইভিসি চাপ সেসব গর্ভবতী নারীদের জন্য বড় ঝুঁকি হতে পারে যাদের ইতোমধ্যে রক্তচাপের সমস্যা অথবা শ্বাস-প্রশ্বাস জনিত জটিলতা আছে।’

উদাহরণসরূপ, অ্যাজমা ও স্লিপ অ্যাপনিয়া আছে এমন গর্ভবতী নারীদের ইতোমধ্যে তাদের শরীর ও শিশুকে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ করতে না পারার মতো সমস্যা আছে। যখন এসব সমস্যার সঙ্গে চিৎ হয়ে ঘুমানোর কারণে রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়ার সমস্যা যোগ হবে, তখন উভয় সমস্যা পরস্পরকে আরো খারাপ অবস্থায় নিয়ে যাবে।

পিয়েন বলেন, ‘অনেক গবেষণায় পাওয়া গেছে, প্রেগন্যান্সির শেষ পর্যায়ে পিঠে ভর দিয়ে ঘুমানোর সঙ্গে মৃত বাচ্চা প্রসব করার উচ্চ ঝুঁকি জড়িত।’ এই সংযোগের পক্ষে প্রমাণ সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতি সম্প্রতি বিজেওজিতে (অবস্টেট্রিকস ও গাইনিকোলজি সম্পর্কিত একটি আন্তর্জাতিক জার্নাল) প্রকাশিত গবেষণা থেকে জানা যায়, যেসব নারীরা ২৮ সপ্তাহ গর্ভধারণের পর মৃত বাচ্চা প্রসব করেছে তারা সুস্থ গর্ভবতী নারীদের তুলনায় ২.৩ গুণ বেশি চিৎ হয়ে শুয়েছিল।’

২০১৭ সালে পিএলওএস ওয়ানে প্রকাশিত অন্য একটি গবেষণায় পাওয়া যায়, পিঠে ভর দিয়ে বা চিৎ হয়ে হয়ে ঘুমালে মৃত বাচ্চা প্রসব করার সম্ভাবনা স্বাভাবিকের তুলনায় ৩.৭ গুণ বেশি। চিৎ হয়ে ঘুমানোর সঙ্গে উচ্চ ঝুঁকি জড়িত থাকার কারণে চিকিৎসকরা গর্ভবতী নারীদের পিঠে ভর দিয়ে না ঘুমাতে পরামর্শ দিতে দ্বিধা করেন না।

ডান পাশে কাত হয়ে ঘুমানো কি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে? এর উত্তর দেওয়া কঠিন, অনেক গবেষণায় গর্ভাবস্থায় ডান পাশ ও বাম পাশে কাত হয়ে ঘুমানো নিয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণ তেমন একটা করা হয়নি। পিয়েন বলেন, ‘আমি মনে করি না যে বাম পাশের তুলনায় ডান পাশে ঘুমানোর সঙ্গে অধিক খারাপ অবস্থার সংযোগ নিয়ে কোনো স্পষ্ট প্রমাণ আছে। যদি কেউ বাম পাশে অস্বস্তি বা সমস্যা অনুভব করার কারণে ডান পাশে কাত হয়ে ঘুমায়, তাহলে এমনটা না করার কোনো কারণ আমি পাই না।’

যদি আপনার সুস্থ প্রেগন্যান্সি থাকে এবং বাম পাশে কাত হয়ে ঘুমাতে না পারেন, ডাহলে ডানপাশে কাত হয়ে ঘুমানো সম্ভবত দুশ্চিন্তার কিছু নয়। পিয়েন বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে এটি আপনার জন্য ভালো হতে পারে, ডান পাশে কাত হয়ে ঘুমানো জনিত আইভিসি চাপের সামান্য ঝুঁকির তুলনায় পর্যাপ্ত ঘুম যেতে না পারা আরো খারাপ প্রেগন্যান্সি আউটপুটের কারণ হতে পারে।’ তিনি যোগ করেন, ‘গবেষণা সাজেস্ট করছে যে যেসব গর্ভবতী নারী পর্যাপ্ত ঘুম যেতে পারে না (প্রতিরাতে ৫-৬ ঘণ্টার কম ঘুম যাওয়া) তারা জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস এবং প্রিক্ল্যাম্পসিয়ার বর্ধিত ঝুঁকিতে থাকে। পর্যাপ্ত ঘুম যাওয়া প্রেগন্যান্সির জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।’

তথ্যসূত্র : লাইভ সায়েন্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thirteen + three =