কয়লা গায়েব : এমডিসহ শীর্ষ ৪ কর্মকর্তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

জালিয়াতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ১ লাখ ১৬ হাজার মেট্রিক টন কয়লা খোলাবাজারে বিক্রি করে প্রায় ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিএমসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (এমডি) শীর্ষ চার কর্মকর্তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

মঙ্গলবার দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরে পাঠানো পৃথক চিঠিতে ওই চার কর্মকর্তার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের অনুরোধ করা হয়েছে।

দুদকের ঊর্ধ্বতন একটি সূত্র রাইজিংবিডিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

কর্মকর্তারা হলেন- বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির এমডি হাবিব উদ্দিন আহমেদ, মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও কোম্পানি সচিব) আবুল কাশেম, খনির মহাব্যবস্থাপক (মাইন অপারেশন) নুরুজ্জামান চৌধুরী ও ডিজিএম (ভাণ্ডার) এ কে এম খালেদুল ইসলাম।

এদিকে, দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রায় ২০০ কোটি টাকার কয়লা আত্মসাতের ঘটনায় বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মো. ফয়েজউল্লাহ ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান মো. শামসুল হাসান মিয়ার বক্তব্য নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

মঙ্গলবার দুদকের পরিচালক ও তদারকি কর্মকর্তা কাজী শফিকুল আলমের নেতৃত্বে বিশেষ টিম পেট্রোবাংলা ও বিপিডিবির প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে চেয়ারম্যানদের বক্তব্য গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র চেয়েছে।

দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে কাগজে-কলমে বেশি কয়লার মজুত দেখিয়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে খতিয়ে দেখতে সোমবার (২৩ জুলাই) তিন সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি গঠন করে দুদক। দুদকের উপ-পরিচালক শামসুল আলমের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিতে সদস্য হিসেবে আছেন সহকারী পরিচালক এ এস এম সাজ্জাদ হোসেন ও উপসহকারী পরিচালক এ এস এম তাজুল ইসলাম।

অভিযোগের বিষয়ে দুদক জানায়, ২০০৫ সালে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে বাণিজ্যিকভাবে কয়লা উত্তোলন শুরু করা হয়। দীর্ঘ ১৩ বছরে কয়লা উত্তোলন হয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ টন। বর্তমানে কোল ইয়ার্ডে কয়লার মজুত থাকার কথা ১ লাখ ৩০ হাজার টন। কিন্তু বাস্তবে কয়লার মজুত পাওয়া গেছে ১৪ হাজার টনের মতো। ১ লাখ ১৬ হাজার টনের মতো কয়লার কোনো হদিস নেই। যার বাজারমূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা। ধারণা করা হচ্ছে, দীর্ঘদিন থেকে একটি চক্র চুরি করে খোলা বাজারে এসব কয়লা বিক্রি করে দিয়েছে।

পিডিবির সূত্র বলছে, বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রে বর্তমানে তিনটি ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে দুটো পুরনো ও একটি নতুন। পুরনো দুটির প্রতিটি ১২৫ মেগাওয়াটের। তবে এগুলোর বর্তমান উৎপাদন ক্ষমতা ৮৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ১ নম্বর ইউনিটটি মেরামতের জন্য বন্ধ রয়েছে। নতুনটির উৎপাদন ক্ষমতা ২৭৪ মেগাওয়াট। চালু দুটি ইউনিট দিয়ে গত জুন মাসের প্রথম দিকে গড়ে ৩৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছিল। কয়লা খনির উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পরের দিন অর্থাৎ ১৭ জুন এ দুই ইউনিট থেকে ৩৩৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। এ দুটি ইউনিট চালাতে দৈনিক সাড়ে ৩ হাজার টন কয়লা লাগে। উৎপাদন বন্ধ থাকায় কয়লার সরবরাহ হ্রাস পেতে থাকে। ফলে বিদ্যুতের উৎপাদনও কমতে থাকে। ২৫ জুন বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় ২৩০ মেগাওয়াট। পরে ২৯ জুন থেকে কর্তৃপক্ষ পুরনো ইউনিটটি বন্ধ করে শুধু নতুন ইউনিটটি চালু রাখে। ১৫ জুলাই এই ইউনিট থেকে ১৯০ মেগাওয়াট এবং ১৯ জুলাই শুক্রবার ১৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। বর্তমানে যতটুকু মজুত রয়েছে, তা দিয়ে একটি ইউনিট চালালেও আর দুই-তিন দিন বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। নতুন করে কয়লা উত্তোলন শুরু হতে পারে আগস্টের শেষে। ফলে প্রায় এক মাস কেন্দ্রটির উৎপাদন বন্ধ থাকবে।

খনির কোল ইয়ার্ড থেকে কয়লা ‘উধাও’ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির শীর্ষ পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কয়লা সরবরাহ না পাওয়ায় বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন রোববার রাতে বন্ধ হয়ে গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 − 7 =